রংপুরে ২০২৪ কোটা সংস্কার আন্দোলনের সময় ছাত্র আবু সায়েদের মৃত্যু এবং ২০১০ সালে তিউনিশিয়ার তুনিসে মোহাম্মদ বুয়াজিজির আত্মদাহের ঘটনা দুটোই রাজনৈতিক উত্তেজনার শীর্ষে ঘটেছে। উভয় ঘটনায় ব্যক্তিগত অবহেলার ফলে জনসাধারণের ন্যায়বিচার ও দায়িত্ববোধের প্রশ্ন তোলা হয়েছে। এই দুই ঘটনার তুলনা করা হলেও, প্রতিটি দেশের ঐতিহাসিক ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রেক্ষাপট ভিন্ন।
মোহাম্মদ বুয়াজিজি, তুনিসের এক গলির বিক্রেতা, ১৭ ডিসেম্বর ২০১০ তার পারমিট ও হেনস্থার সমস্যায় স্থানীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বহুবার সংঘর্ষের পর আত্মদাহ করেন। তার আত্মহত্যা কোনো সরকারকে এক রাতেই উল্টে দেয়নি, তবে তা আরব বসন্তের সূচনা চিহ্নিত করে। বুয়াজিজির কাজের মাধ্যমে জনগণ বুঝতে পারে যে দৈনন্দিন অবহেলা ও অপমানের পরিণতি দীর্ঘমেয়াদে রাজনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারে।
বুয়াজিজির আত্মদাহের পর আরব অঞ্চলে ব্যাপক প্রতিবাদ, সরকারবদল এবং নতুন সংবিধান প্রণয়নের চাহিদা দেখা যায়। তবে এই আন্দোলনের ফলাফল একাধিক দেশে ভিন্ন রূপ নেয়; কিছু দেশে শাসন পরিবর্তন হয়, আবার কিছু দেশে কেবল নীতি সংশোধনই ঘটে। মূলত, বুয়াজিজির ঘটনা দেখায় যে নাগরিকের মৌলিক মর্যাদা ক্ষুণ্ন হলে তা রাষ্ট্রের কাঠামোকে চ্যালেঞ্জ করতে পারে।
বাংলাদেশে ২০২৪ কোটা সংস্কার আন্দোলনের সময় রংপুরের এক কলেজের ছাত্র আবু সায়েদ, শিক্ষার্থীদের কর্মসংস্থান ও ভর্তি নীতির ন্যায়বিচার চাহিদা জানাতে প্রতিবাদে অংশ নেন। প্রতিবাদে নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষের পর সায়েদের মৃত্যু ঘটায় দেশব্যাপী শোক ও নিন্দা প্রকাশ পায়। তার মৃত্যু কোটা সংস্কার নিয়ে চলমান বিতর্ককে তীব্র করে এবং সরকারকে নীতি পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানায়।
আবু সায়েদের মৃত্যুর পর রংপুরে এবং দেশের অন্যান্য অংশে প্রতিবাদ তীব্রতর হয়। শিক্ষার্থী ও শ্রমিক গোষ্ঠী দাবি করে যে কোটা নীতি স্বচ্ছতা, ন্যায়বিচার এবং সুযোগের সমতা নিশ্চিত করতে হবে। সরকারী দফতরগুলো এই দাবিগুলোকে স্বীকৃতি দিয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে বিশেষ কমিটি গঠন ও নীতি পর্যালোচনার প্রতিশ্রুতি দেয়। তবে নিরাপত্তা বাহিনীর ব্যবহৃত বলপ্রয়োগের পদ্ধতি নিয়েও সমালোচনা বাড়ে।
এই সময়ে বাংলাদেশ পার্লামেন্টের আসন্ন নির্বাচনের প্রস্তুতি চলছে। প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো—আওয়ামী লীগ ও বিএনপি—উভয়ই কোটা সংস্কারকে ভোটের মূল বিষয় হিসেবে তুলে ধরছে। আওয়ামী লীগ সরকারী দায়িত্বে থাকা অবস্থায় নীতি সংশোধনের জন্য আইনসভার অনুমোদন চায়, আর বিরোধী দল ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার জন্য স্বাধীন তদন্তের দাবি করে। উভয় পক্ষই সায়েদের মৃত্যুকে রাজনৈতিক দায়িত্বের উদাহরণ হিসেবে ব্যবহার করে ভোটারদের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করছে।
বুয়াজিজি ও সায়েদের ঘটনাকে সরাসরি তুলনা করা সহজ নয়; তিউনিশিয়ার আরব বসন্তের পর দেশীয় শাসন কাঠামোতে ব্যাপক পরিবর্তন ঘটলেও, বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রক্রিয়া দীর্ঘমেয়াদী ব্যুরোকারিক ধারাবাহিকতা ও সামাজিক সংহতির ওপর নির্ভরশীল। তাই উভয় ঘটনার সাদৃশ্যের মূল বিষয় হল ক্ষমতার প্রতি নাগরিকের নৈতিক প্রত্যাশা, তবে ফলাফল ও প্রক্রিয়া ভিন্ন হতে পারে।
অবশেষে, বুয়াজিজি ও সায়েদের মৃত্যুর পর সরকারী ও বিচারিক সংস্থাগুলোকে নীতি, নিয়োগ, বাজেট এবং প্রশাসনিক পদ্ধতিতে স্বচ্ছতা ও দায়িত্ববোধ বাড়াতে হবে। বিশেষ কমিটির রিপোর্ট, আদালতের রায় এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের পদক্ষেপই ভবিষ্যতে এই ধরনের সংঘাতের পুনরাবৃত্তি রোধে মূল ভূমিকা রাখবে। রাজনৈতিক নেতৃত্বের নৈতিক দায়িত্ব এবং নাগরিকের মৌলিক অধিকার রক্ষার মধ্যে সমতা বজায় রাখা দেশের দীর্ঘমেয়াদী স্থিতিশীলতার চাবিকাঠি হবে।



