সিরিয়ার দক্ষিণে ইরাক ও জর্ডান সীমান্তের নিকটবর্তী আল‑তানফ সামরিক ঘাঁটি, যা দীর্ঘদিন যুক্তরাষ্ট্রের উপস্থিতি ছিল, এখন সিরিয়ার সশস্ত্র বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে এসেছে। সিরিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমন্বয় করে সিরিয়ান আরব সেনাবাহিনী ঘাঁটি ও পার্শ্ববর্তী এলাকা নিরাপদে নিজেদের হাতে নিয়েছে এবং সীমান্তে অতিরিক্ত সেনা মোতায়েনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। একই সঙ্গে, কয়েক দিনের মধ্যে সীমান্ত রক্ষী বাহিনীর দায়িত্ব হস্তান্তর করা হবে।
আল‑তানফ ঘাঁটি ২০১৪ সালে গৃহযুদ্ধের মাঝামাঝি সময়ে নির্মিত হয়, যখন আন্তর্জাতিক জোটের মধ্যে আইএসআইএল ও আইএস দমন করার জন্য এটি কৌশলগত কেন্দ্র হিসেবে কাজ করত। ২০১৭ সালের পর আইএসের সামরিক ক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পায়, ফলে ঘাঁটির কৌশলগত গুরুত্ব কিছুটা কমে যায়। তবুও, যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদী উপস্থিতি অঞ্চলের নিরাপত্তা কাঠামোর একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল। সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের সৈন্য সংখ্যা কমে যাওয়ায়, ঘাঁটি থেকে তাদের প্রত্যাহার ঘটেছে, যদিও সরকারীভাবে কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণার মাধ্যমে তা জানানো হয়নি।
সিরিয়ার সরকার বর্তমানে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পুনরায় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়ায় রয়েছে। বিশেষ করে, কুর্দি-নেতৃত্বাধীন সিরিয়ান ডেমোক্রেটিক ফোর্সেস (এসডিএফ) এবং সিরিয়ান সরকারের মধ্যে সাম্প্রতিক চুক্তি, যা যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় সম্পন্ন হয়েছে, দেশের জাতীয় ঐক্য ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে গৃহীত হয়েছে। এই চুক্তি অনুসারে, এসডিএফের কাঠামো সরকারী সিস্টেমের সঙ্গে সংহত হবে এবং উভয় পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষের ঝুঁকি কমবে বলে আশা করা হচ্ছে।
উত্তর‑পূর্ব সিরিয়ায় সরকার ও এসডিএফের মধ্যে পূর্বে সংঘর্ষের পর, উভয় পক্ষের মধ্যে একটি স্থায়ী যুদ্ধবিরতি স্বাক্ষরিত হয়েছিল, যা সাম্প্রতিক সময়ে বজায় রয়েছে। তবে, আল‑তানফের মতো কৌশলগত স্থানে নিয়ন্ত্রণের পরিবর্তন অঞ্চলীয় নিরাপত্তা গতিবিধিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন, সিরিয়ার নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধার এবং যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতির হ্রাস মধ্যপ্রাচ্যের শক্তি ভারসাম্যের পুনর্গঠনকে সূচিত করতে পারে।
একজন আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিশারদ বলেন, “আল‑তানফের পুনরায় সিরিয়ান হাতে পড়া, কেবলমাত্র সিরিয়ার ভূখণ্ডীয় অখণ্ডতার পুনঃপ্রতিষ্ঠা নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপ্রাচ্য নীতি পরিবর্তনের সূচকও হতে পারে।” তিনি আরও যোগ করেন, “এই পরিবর্তনটি ইরাক ও জর্ডানের সঙ্গে সীমান্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থার পুনর্বিবেচনা প্রয়োজন করবে, কারণ ঘাঁটির অবস্থান উভয় দেশের সঙ্গে সরাসরি সংযুক্ত।”
অঞ্চলীয় নিরাপত্তা দৃষ্টিকোণ থেকে, সিরিয়ার সেনাবাহিনীর নতুন মোতায়েন সীমান্তে অতিরিক্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে সহায়তা করবে বলে অনুমান করা হচ্ছে। বিশেষ করে, গ্যাস ও তেল রিজার্ভের নিকটবর্তী এলাকায় অবৈধ সশস্ত্র গোষ্ঠীর কার্যক্রম হ্রাস পেতে পারে। তবে, কিছু নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ সতর্ক করেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের হ্রাসমান উপস্থিতি গোষ্ঠীগুলোর জন্য শূন্যস্থান তৈরি করতে পারে, যা নতুন সংঘাতের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
আল‑তানফের নিয়ন্ত্রণ পরিবর্তনের পরবর্তী ধাপ হিসেবে, সিরিয়ার সরকার সীমান্তে গার্ড ও পর্যবেক্ষণ ইউনিট স্থাপন করার পরিকল্পনা প্রকাশ করেছে। এই ইউনিটগুলোকে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করতে হবে, যাতে সীমান্তে অবৈধ পারাপার ও অস্ত্র পাচার রোধ করা যায়। একই সঙ্গে, সিরিয়ার কূটনৈতিক মন্ত্রণালয় আশাবাদ প্রকাশ করেছে যে, এই পদক্ষেপগুলো প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে নিরাপত্তা সহযোগিতা বাড়াবে এবং দীর্ঘমেয়াদী স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করবে।
সারসংক্ষেপে, আল‑তানফ ঘাঁটির সিরিয়ান সেনাবাহিনীর হাতে হস্তান্তর, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হ্রাস এবং এসডিএফের সঙ্গে চুক্তি, সিরিয়ার ভূ-রাজনৈতিক দৃশ্যপটকে নতুন রূপ দিচ্ছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টিতে, এই পরিবর্তনগুলো মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা কাঠামোর পুনর্গঠন, কূটনৈতিক সংলাপের নতুন সুযোগ এবং সম্ভাব্য ঝুঁকির সমন্বয়কে নির্দেশ করে। ভবিষ্যতে, সীমান্ত রক্ষার সম্পূর্ণ হস্তান্তর এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সমন্বিত নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তোলা, এই অঞ্চলের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার মূল মাইলস্টোন হিসেবে বিবেচিত হবে।



