বৈজ্ঞানিক গবেষণায় প্রকাশিত হয়েছে যে, পৃথিবীর সব জীবের পূর্বপুরুষ হিসেবে ধরা যেত লাস্ট ইউনিভার্সাল কমন অ্যানসেস্টর (LUCA) এর আগে আরও প্রাচীন জিনের অস্তিত্ব নিশ্চিত হয়েছে। এই ফলাফল MIT এবং ওবারলিন কলেজের গবেষক দলের কাজের ওপর ভিত্তি করে। গবেষণাটি “Cell Genomics” জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে, যা জীববৈচিত্র্যের উত্স নিয়ে নতুন দৃষ্টিকোণ উপস্থাপন করে।
প্রচলিতভাবে বিজ্ঞানীরা বিশ্বাস করতেন, জীবনের সূচনা একক কোষ থেকে হয়েছে, যার নাম ছিল LUCA। এই কোষকে প্রায় ৪২০ কোটি বছর আগে পৃথিবীতে বাসকারী সকল ব্যাকটেরিয়া, উদ্ভিদ, প্রাণী ও মানুষের পূর্বপুরুষ হিসেবে ধরা হতো। এ ধারণা বহু বছর ধরে জীববিজ্ঞান পাঠ্যপুস্তকে মৌলিক সত্য হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে।
নতুন গবেষণায় দেখা গেছে, LUCA প্রকৃতপক্ষে জীবনের প্রথম ধাপ নয়; বরং তার আগে একটি অজানা যুগের কোষের সমষ্টি ছিল, যার থেকে LUCA উদ্ভূত হয়েছে। গবেষকরা এই তত্ত্বকে সমর্থন করার জন্য বিশেষ কিছু জিনের উপস্থিতি চিহ্নিত করেছেন, যেগুলোকে “ইউনিভার্সাল প্যারালগ” বলা হয়।
এই গবেষণাপত্রটি “Cell Genomics”-এর সর্বশেষ সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছে, যেখানে গবেষকদের বিশ্লেষণ পদ্ধতি ও ফলাফল বিস্তারিতভাবে উপস্থাপিত হয়েছে। গবেষণায় যুক্তরাষ্ট্রের MIT এবং ওবারলিন কলেজের বিজ্ঞানীরা সহযোগিতা করেছেন, এবং তাদের কাজ আন্তর্জাতিক জিনোমিক্স সম্প্রদায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।
লুকা প্রায় ৪২০ কোটি বছর আগে বিদ্যমান ছিল, এবং আজকের সব জীবের বংশধর হিসেবে বিবেচিত হয়। তবে গবেষকরা যুক্তি দেন, লুকার পূর্বে এমন এক সময় ছিল, যখন কোষগুলো স্বাধীনভাবে অস্তিত্ব বজায় রাখে এবং একে অপরের সঙ্গে ডিএনএ বিনিময় করত। এই প্রক্রিয়ার ফলে আজকের জীবের মধ্যে থাকা কিছু মৌলিক জিনের উৎপত্তি ঘটেছে।
ইউনিভার্সাল প্যারালগ বলতে এমন জিনকে বোঝানো হয়, যেগুলো সব জীবের মধ্যে পুনরাবৃত্তি হয়ে থাকে এবং তাদের কাঠামো প্রায় একই রকম। গবেষকরা দেখেছেন, এই জিনগুলো LUCA-এর আগে থেকেই গঠিত হয়েছিল এবং জীবের শাখা-প্রশাখা গঠনের পূর্বে তাদের উপস্থিতি নিশ্চিত। ফলে, জীবের বিবর্তনমূলক গাছের শিকড়ে এই জিনগুলোকে মূল ভিত্তি হিসেবে ধরা যেতে পারে।
প্রাচীন জিনের অস্তিত্ব প্রমাণের জন্য গবেষকরা সরাসরি জীবাশ্মের ওপর নির্ভর করতে পারেননি, কারণ এত পুরোনো সময়ের কোনো ফসিল পাওয়া যায় না। তাই তারা জিনের ক্রমবিকাশের চিহ্ন অনুসন্ধান করে ঐতিহাসিক তথ্য বের করেছেন। জিনের সিকোয়েন্স বিশ্লেষণ ও তুলনামূলক জিনোমিক্স পদ্ধতি ব্যবহার করে তারা দেখেছেন, এই জিনগুলো বহু শাখার মধ্যে সংরক্ষিত হয়েছে।
প্রাচীন জিনগুলো মূলত কোষের মৌলিক কাজের সঙ্গে যুক্ত, যেমন প্রোটিন সংশ্লেষণ, কোষের ঝিল্লি গঠন ও রক্ষণাবেক্ষণ। প্রোটিন হল জীবের গঠন ও কার্যকারিতার কেন্দ্রীয় উপাদান, এবং কোষের সুরক্ষা ব্যবস্থা বজায় রাখতে এই জিনের ভূমিকা অপরিহার্য। ফলে, এই জিনগুলো সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সংরক্ষিত হয়ে আজ পর্যন্ত পৌঁছেছে।
বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ নির্দেশ করে যে, প্রাচীন জীবের অনেক রূপ সময়ের সঙ্গে বিলুপ্ত হয়েছে, তবে কার্যকরী জিনগুলো টিকে থেকে বর্তমান জীবের জেনেটিক কোডে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। এই ধারাবাহিকতা জীবের বিবর্তনের ধারাবাহিকতা ও স্থিতিশীলতা ব্যাখ্যা করে। গবেষকরা জোর দিয়ে বলেন, এই জিনগুলোই জীবের মৌলিক কার্যক্রমের ভিত্তি গড়ে তুলেছে।
এই আবিষ্কার জীবের উত্স নিয়ে প্রচলিত ধারণাকে পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানায়। লুকা একমাত্র পূর্বপুরুষ নয়, বরং তার পূর্বে একটি জিনগত নেটওয়ার্ক ছিল, যা পরবর্তীতে LUCA-কে গঠন করেছে। ভবিষ্যতে এই প্রাচীন জিনের আরও বিশদ বিশ্লেষণ জীববৈচিত্র্যের সূক্ষ্মতা উন্মোচনে সহায়তা করবে।
পাঠকদের জন্য একটি প্রশ্ন রয়ে যায়: যদি জীবের মূল ভিত্তি এমন প্রাচীন জিনে নিহিত থাকে, তবে বর্তমান জীববৈচিত্র্যের রক্ষণাবেক্ষণ ও সংরক্ষণে আমাদের কৌশল কীভাবে পরিবর্তন করা উচিত? এই দৃষ্টিকোণ থেকে গবেষণার ফলাফলকে কাজে লাগিয়ে পরিবেশ সংরক্ষণ ও জেনেটিক গবেষণায় নতুন দিকনির্দেশনা নির্ধারণ করা প্রয়োজন।



