ইন্দোনেশিয়ার দক্ষিণ সুমাত্রা দ্বীপের ল্যাম্পুং প্রদেশে টোল রোডে এফ-সিক্সটিন যুদ্ধবিমান ও সুপার টুকানো আক্রমণাত্মক প্লেনের সফল অবতরণ ও উড্ডয়ন সম্পন্ন হয়েছে। এই পরীক্ষা দেশের প্রতিটি প্রদেশকে বিমানবাহী রণতরী হিসেবে রূপান্তর করার বৃহৎ পরিকল্পনার অংশ হিসেবে পরিচালিত হয়। পরিকল্পনাটি জাকার্তা সরকারের সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে, নতুন ক্যারিয়ার কেনার বদলে বিদ্যমান সড়ক ও মহাসড়ককে জরুরি রানওয়ে হিসেবে ব্যবহার করার লক্ষ্য রাখে।
ইন্দোনেশিয়ার ৩৮টি প্রদেশের প্রত্যেকটিতে অন্তত একটি টোল রোডের অংশকে বিমান অবতরণে ব্যবহারযোগ্য করা হবে বলে সরকার ঘোষণা করেছে। এধরনের রণতরী রূপান্তরকে “রোড রানওয়ে” বলা হয় এবং এটি দেশের বিস্তৃত দ্বীপপুঞ্জের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার নতুন কৌশল হিসেবে বিবেচিত। পরিকল্পনাটি উচ্চ ব্যয়বহুল বিমানবাহী ক্যারিয়ার রক্ষণাবেক্ষণের তুলনায় কম খরচে সমগ্র জাতিকে রক্ষা করার সম্ভাবনা প্রদান করে।
সম্প্রতি ল্যাম্পুং প্রদেশের টোল রোডে এফ-সিক্সটিন ফাইটার জেট এবং সুপার টুকানো আক্রমণাত্মক প্লেন উভয়েরই অবতরণ ও উড্ডয়ন সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। উভয় বিমানই স্বল্প সময়ের মধ্যে রোডে স্পর্শ করে দ্রুত আবার আকাশে ফিরে যায়, যা রোডের প্রস্থ ও পৃষ্ঠের অবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল। পরীক্ষার সময় কোনো দুর্ঘটনা না ঘটায়, ইন্দোনেশীয় বিমানবাহিনীর কর্মীরা রোডকে সামরিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করার সক্ষমতা নিশ্চিত করেছে।
ইন্দোনেশীয় বিমানবাহিনীর প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল টনি হারজোনো উল্লেখ করেছেন, “প্রতিটি প্রদেশে নির্ধারিত টোল রোড সেকশনগুলো জরুরি অবস্থায় রানওয়ে হিসেবে কাজ করতে সক্ষম হবে।” তিনি আরও যোগ করেন, “এই ব্যবস্থা আমাদের আকাশসীমা রক্ষার বিকল্প পথ সরবরাহ করবে এবং একক ক্যারিয়ার ধ্বংস হলে পুরো সিস্টেমে প্রভাব না ফেলতে দেবে।” তার কথায় রোডের প্রশস্ততা ও নিরাপত্তা বিষয়ক বিশেষ প্রশিক্ষণের গুরুত্বও প্রকাশ পেয়েছে।
ইন্দোনেশিয়ার উপ-প্রতিরক্ষামন্ত্রী ডনি এরমাওয়ান তৌফান্তো একই পরীক্ষাকে দেশের প্রতিরক্ষা ক্ষমতা বাড়ানোর গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, “সাধারণ বিমানবন্দর রানওয়ের চেয়ে মহাসড়কগুলো অনেক বেশি সরু, তাই এখানে বিমান অবতরণ ঝুঁকিপূর্ণ, তবে আমাদের পাইলটরা বিশেষ প্রশিক্ষণ নিয়ে এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করছে।” তৌফান্তো রোডের গড় প্রস্থ প্রায় ২৪ মিটার, যেখানে আন্তর্জাতিক মানের বিমানবন্দর রানওয়ে ৪৫ থেকে ৬০ মিটার পর্যন্ত হয়, তা উল্লেখ করে।
বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করেন, ইন্দোনেশিয়ার মতো ছয় হাজারেরও বেশি জনবসতিপূর্ণ দ্বীপবিশিষ্ট দেশে প্রচলিত ক্যারিয়ার রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়বহুল এবং একক ক্যারিয়ার ধ্বংস হলে সামগ্রিক ক্ষমতা হ্রাস পায়। রোড রানওয়ে ব্যবস্থা একাধিক বিকল্প পথ সরবরাহের মাধ্যমে সামরিক কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করে। এছাড়া, রোডের বিস্তৃত নেটওয়ার্কের কারণে কোনো একক সেকশন ক্ষতিগ্রস্ত হলেও দ্রুত বিকল্প রুট ব্যবহার করা সম্ভব।
কৌশলগত দৃষ্টিকোণ থেকে রোডকে রানওয়ে হিসেবে ব্যবহার করা ইন্দোনেশিয়াকে আঞ্চলিক নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জের মুখে দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানাতে সক্ষম করে। দক্ষিণ চীন সাগরের পার্শ্ববর্তী উত্তেজনা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই পদক্ষেপটি দেশের আকাশসীমা রক্ষায় প্রচলিত পদ্ধতির বাইরে গিয়ে টেকসই সমাধান প্রদান করে। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা ইন্দোনেশিয়ার এই উদ্যোগকে সমুদ্রসীমা রক্ষা এবং আঞ্চলিক শক্তি ভারসাম্য বজায় রাখার নতুন মডেল হিসেবে উল্লেখ করছেন।
অধিকন্তু, রোড রানওয়ে ব্যবস্থার মাধ্যমে ইন্দোনেশিয়া সামরিক সরবরাহ শৃঙ্খলকে বহুমুখী করতে পারবে। জরুরি অবস্থায় সাপ্লাই ট্রাক, ট্যাঙ্কার ও অন্যান্য লজিস্টিক্স সরঞ্জাম রোডে চলতে পারে, একই সাথে বিমানও দ্রুত অবতরণ করতে পারবে। এই দ্বৈত ব্যবহার ক্ষমতা দেশকে যুদ্ধের সময় দ্রুত পুনরায় গঠন ও রক্ষণাবেক্ষণ করতে সহায়তা করবে।
আঞ্চলিক নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা ইন্দোনেশিয়ার এই কৌশলকে দক্ষিণ চীন সাগরের জটিল ভূ-রাজনৈতিক পরিবেশে একটি সতর্কতা হিসেবে ব্যাখ্যা করছেন। দেশটি রণতরী রূপান্তরের মাধ্যমে সম্ভাব্য শত্রু শক্তির আক্রমণকে প্রতিহত করার জন্য অতিরিক্ত স্তর যোগ করেছে। একই সঙ্গে, এই পদক্ষেপটি অন্যান্য দ্বীপজাত দেশগুলোর জন্যও অনুকরণীয় মডেল হতে পারে, যেখানে সীমিত বাজেটের মধ্যে সামরিক সক্ষমতা বাড়ানো প্রয়োজন।
সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৬ সালের শেষের মধ্যে সব ৩৮টি প্রদেশে নির্ধারিত টোল রোড সেকশনগুলোকে রণতরী হিসেবে প্রস্তুত করা হবে। প্রতিটি সেকশনকে বিশেষভাবে চিহ্নিত করা হবে এবং পাইলটদের জন্য নিয়মিত প্রশিক্ষণ সেশন চালু করা হবে। ভবিষ্যতে রোডের রক্ষণাবেক্ষণ ও আপডেটের জন্য অতিরিক্ত তহবিল বরাদ্দ করা হবে, যাতে জরুরি অবস্থায় সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়।
ইন্দোনেশিয়ার এই রণতরী রূপান্তর পরিকল্পনা দেশীয় নিরাপত্তা নীতি ও আঞ্চলিক কূটনৈতিক ভারসাম্যের মধ্যে নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। রোডকে বিমানবাহী প্ল্যাটফর্মে রূপান্তর করে দেশটি সামরিক সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি ব্যয় সাশ্রয় এবং কৌশলগত স্বনির্ভরতা অর্জনের পথে অগ্রসর হয়েছে।



