তুর্কি প্রেসিডেন্ট রেশেপ তায়িপ এরদোয়ান ২০২৪ সালের শুরুর দিকে একটি বিশাল ভৌগোলিক সংযোগের ধারণা উপস্থাপন করেন, যেখানে এশিয়া থেকে আফ্রিকা, ইউরোপ থেকে মধ্যপ্রাচ্য পর্যন্ত বিস্তৃত মুসলিম দেশগুলোকে একত্রিত করা হবে। তিনি উল্লেখ করেন, এই বিস্তৃত অঞ্চলের প্রাকৃতিক করিডোর, তরুণ জনশক্তি এবং দ্রুত বর্ধনশীল বাজারগুলোকে কৌশলগত শক্তিতে রূপান্তর করতে একটি দক্ষ ও নির্ভরযোগ্য যোগাযোগ নেটওয়ার্ক অপরিহার্য।
এরদোয়ান জোর দিয়ে বলেন, ওআইসি (ইসলামিক কোঅপারেশন অর্গানাইজেশন) সদস্য দেশগুলোর মধ্যে মহাসড়ক, রেলপথ, সমুদ্রবন্দর এবং বিমানবন্দরগুলোর সংযোগ শক্তিশালী হলে তা কেবল বাণিজ্যিক লেনদেন বাড়াবে না, বরং সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মিথস্ক্রিয়াকেও ত্বরান্বিত করবে। তিনি এই ধারণাকে সমর্থন করার জন্য তুরস্কের নিজস্ব অবকাঠামো উন্নয়নের উদাহরণ তুলে ধরেন।
তুরস্কের সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মারমারা রেল টানেল, ইউরেশিয়া টানেল এবং বহু বড় সেতু নির্মাণের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য পথে তার অবস্থান দৃঢ় হয়েছে। এই প্রকল্পগুলো কেবল দেশীয় পরিবহনকে সহজ করে না, বরং ইউরোপ ও এশিয়ার মধ্যে পণ্য প্রবাহকে দ্রুততর করে তুলেছে। এরদোয়ান এই সাফল্যকে মডেল হিসেবে ব্যবহার করে অন্যান্য মুসলিম দেশকে একই রকম অবকাঠামো গড়ে তুলতে উৎসাহিত করেন।
বিশেষ করে ট্রান্স-কাস্পিয়ান ইস্ট‑ওয়েস্ট মিডল করিডোর প্রকল্পের দিকে তার দৃষ্টি নিবদ্ধ। এই উদ্যোগের মাধ্যমে ঐতিহাসিক সিল্ক রোডকে আধুনিক রেল ও সড়ক নেটওয়ার্কে রূপান্তর করা হবে, যা মধ্য এশিয়া, ককেশাস এবং ইউরোপের মধ্যে সরাসরি সংযোগ স্থাপন করবে। তুরস্কের এই প্রকল্পে অংশগ্রহণের লক্ষ্য কেবল বাণিজ্যিক সুবিধা নয়, বরং ঐতিহ্যবাহী রুটকে পুনরুজ্জীবিত করে সাংস্কৃতিক বিনিময়কে উত্সাহিত করা।
এরদোয়ান স্পষ্ট করেন, তুরস্ক এই বিশাল বিনিয়োগগুলোকে কেবল জাতীয় স্বার্থে দেখছে না। তার মূল উদ্দেশ্য ওআইসি সদস্য দেশগুলোর মধ্যে সংহতি বাড়ানো এবং যৌথ প্রকল্পের মাধ্যমে আন্তঃসীমান্ত করিডোর তৈরি করা। তিনি উল্লেখ করেন, এমন সংযোগগুলো তরুণ কর্মশক্তির জন্য নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে এবং অঞ্চলভিত্তিক বেকারত্বের হার কমাতে সহায়তা করবে।
ডিজিটাল যোগাযোগের ক্ষেত্রেও তিনি সমান গুরুত্ব আরোপ করেন। দীর্ঘ দূরত্বের লজিস্টিক্স ও পণ্য প্রবাহকে সমন্বয় করতে উচ্চগতির ইন্টারনেট এবং তথ্যপ্রযুক্তি নেটওয়ার্ক অপরিহার্য, তাই তুরস্কের অভিজ্ঞতা ও প্রযুক্তি শেয়ার করার ইচ্ছা প্রকাশ করেন।
এই পরিকল্পনা সম্পর্কে ওআইসি সদস্য দেশগুলো থেকে ইতিবাচক সাড়া পাওয়া গেছে। কিছু দেশ তাদের অর্থনৈতিক নীতি ও বাণিজ্যিক কৌশলে এই সংযোগকে অন্তর্ভুক্ত করার সম্ভাবনা প্রকাশ করেছে, যা বৃহত্তর বাজারে প্রবেশের নতুন দরজা খুলে দেবে।
অন্যদিকে, কিছু বিশ্লেষক এবং অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞ এই ধরনের বিশাল প্রকল্পের আর্থিক দিক নিয়ে সতর্কতা প্রকাশ করেছেন। তারা উল্লেখ করেন, দীর্ঘমেয়াদী ঋণ এবং বাজেটের চাপকে বিবেচনা না করলে প্রকল্পের টেকসইতা ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। তাই যথাযথ খরচ‑লাভ বিশ্লেষণ এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক সহায়তা নিশ্চিত করা জরুরি।
তুরস্ক সরকার এই উদ্বেগগুলোকে মোকাবেলা করতে প্রযুক্তিগত সহায়তা, প্রশিক্ষণ এবং সম্ভাব্য অর্থায়ন মেকানিজম প্রদান করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছে। তুরস্কের অভিজ্ঞ প্রকৌশল দল এবং নির্মাণ সংস্থাগুলোকে অংশীদার দেশগুলোকে পরামর্শ ও বাস্তবায়ন সহায়তা দিতে প্রস্তুত বলা হয়েছে।
এরদোয়ানের পরিকল্পনা আগামী ওআইসি শীর্ষ সম্মেলনে আনুষ্ঠানিকভাবে আলোচনা হবে। সেখানে সদস্য দেশগুলোকে নির্দিষ্ট সময়সূচি, তহবিলের উৎস এবং বাস্তবায়ন ধাপ নির্ধারণের জন্য একত্রিত করা হবে। সম্মেলনের ফলাফল অনুযায়ী প্রকল্পের সূচনা ও অগ্রগতি নির্ধারিত হবে।
যদি এই সংযোগ নেটওয়ার্ক সফলভাবে গড়ে ওঠে, তবে মুসলিম বিশ্বের বাণিজ্যিক মানচিত্রে বড় পরিবর্তন আসবে। পরিবহন খরচ কমে যাবে, পণ্য সরবরাহের সময়সীমা হ্রাস পাবে এবং বিভিন্ন দেশের ব্যবসায়িক সংযোগ আরও ঘনিষ্ঠ হবে। তদুপরি, সীমানা পারাপার সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, শিক্ষামূলক আদানপ্রদান এবং পর্যটনও নতুন মাত্রা পাবে, যা দীর্ঘমেয়াদে অঞ্চলের সমৃদ্ধি ও স্থিতিশীলতা বাড়াবে।



