উত্তর কোরিয়ার সর্বোচ্চ নেতা কিম জং উন তার কিশোরী কন্যা কিম জু আয়ে-কে দেশের ভবিষ্যৎ শাসক হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে গড়ে তোলার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। কিম জু আয়ে সাম্প্রতিক সময়ে রাষ্ট্রের প্রধান অনুষ্ঠানগুলোতে ধারাবাহিকভাবে উপস্থিত হয়ে তার রাজনৈতিক অবস্থানকে দৃঢ় করেছে। তার উপস্থিতি বিশেষ করে সশস্ত্র বাহিনী দিবস ও কুমসুসান প্যালেস অব দ্য সান পরিদর্শনের সময় লক্ষ্যণীয় ছিল, যা উত্তর কোরিয়ার প্রতিষ্ঠাতা কিম ইল সুং ও কিম জং ইলের সমাধিস্থল হিসেবে সর্বোচ্চ পবিত্রতা ধারণ করে।
দক্ষিণ কোরিয়ার সংবাদ সংস্থা ইয়োনহাপের তথ্য অনুযায়ী, কিম জু আয়ে-র সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ড তার উত্তরাধিকারী হওয়ার সম্ভাবনাকে আরও স্পষ্ট করেছে। বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেছেন, যদি চলতি মাসের শেষের দিকে ওয়ার্কার্স পার্টির কংগ্রেসে তাকে কোনো বিশেষ পদবি বা সম্মাননা প্রদান করা হয়, তবে তার শাসনসামগ্রিকতা আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি পাবে।
কিম জু আয়ে-র প্রথমবারের মতো জনসাধারণের সামনে উপস্থিতি ২০২২ সালে বাবার সঙ্গে একটি আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ স্থানে দেখা গিয়েছিল। সেই সময় থেকে তিনি ধারাবাহিকভাবে সামরিক মহড়া, বিমান প্রদর্শনী এবং আন্তর্জাতিক সফরে অংশগ্রহণ করছেন। বেইজিং সফরে তিনি চীনের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে সৌজন্য বিনিময় করেছেন এবং রাশিয়ার উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সাথেও সাক্ষাৎ করেছেন।
দক্ষিণ কোরিয়ার গোয়েন্দা সংস্থা জানিয়েছে, কিম জং উন বর্তমানে একটি বিশাল সাবমেরিনের নির্মাণ তদারকি করছেন, যা পারমাণবিক শক্তিতে চালিত এবং একবারে অন্তত দশটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের সক্ষমতা রাখে। এই প্রকল্পটি উত্তর কোরিয়ার সামরিক ক্ষমতা বৃদ্ধি করার বৃহৎ পরিকল্পনার অংশ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
কিম জু আয়ে-র উপস্থিতি কোরিয়ার সামরিক ও রাজনৈতিক অনুষ্ঠানে কেবল প্রতীকী নয়, বরং কিম জং উনের শাসন কাঠামোর মধ্যে তার ভূমিকা স্পষ্ট করার একটি কৌশলগত পদক্ষেপ। তার উপস্থিতি জাতীয় নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা নীতির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত, যা ভবিষ্যতে তার শাসনকালকে নির্ধারণ করবে।
কোরিয়ার অভ্যন্তরীণ বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন, কিম জু আয়ের সরকারী অনুষ্ঠানে উপস্থিতি তাকে জাতীয় নেতৃত্বের দৃশ্যপটে স্বাভাবিক করে তুলছে। যদি ওয়ার্কার্স পার্টির কংগ্রেসে তাকে কোনো উচ্চ পদ বা সম্মাননা প্রদান করা হয়, তবে তার উত্তরাধিকারী হওয়ার প্রক্রিয়া স্বয়ংক্রিয়ভাবে ত্বরান্বিত হবে।
কিম জু আয়ে-র আন্তর্জাতিক সফরগুলোও তার রাজনৈতিক প্রশিক্ষণের অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। বেইজিং সফরে তিনি চীনের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করে কোরিয়ার নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা বাড়ানোর লক্ষ্যে সমঝোতা গড়ে তোলার চেষ্টা করেছেন। রাশিয়ার সঙ্গে তার সাক্ষাৎও পারস্পরিক কৌশলগত স্বার্থের ভিত্তিতে পরিচালিত হয়েছে।
উত্তর কোরিয়ার সর্বোচ্চ নেতা কিম জং উন যে বড় সাবমেরিন প্রকল্পের তত্ত্বাবধান করছেন, তা দেশের সামরিক আধুনিকীকরণে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। পারমাণবিক চালিত এই নৌযানটি একাধিক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের ক্ষমতা রাখে, যা আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা পরিবেশে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।
কিম জু আয়ে-র সামরিক প্রশিক্ষণ ও আন্তর্জাতিক ভ্রমণ তাকে ভবিষ্যৎ শাসকের প্রস্তুতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে সাহায্য করছে। তার উপস্থিতি কোরিয়ার জনগণের কাছে তার নেতৃত্বের স্বীকৃতি বাড়াচ্ছে এবং পার্টি ও সেনাবাহিনীর সমর্থন জোরদার করছে।
যদি ওয়ার্কার্স পার্টির কংগ্রেসে তাকে বিশেষ পদবী প্রদান করা হয়, তবে কিম জু আয়ে-র উত্তরাধিকারী হওয়ার প্রক্রিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে সম্পন্ন হবে বলে বিশ্লেষকরা অনুমান করছেন। এই পদক্ষেপটি উত্তর কোরিয়ার শাসন কাঠামোকে এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে মসৃণভাবে স্থানান্তর নিশ্চিত করবে।
কিম জং উনের এই কৌশলগত পরিকল্পনা দেশের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা এবং আন্তর্জাতিক মঞ্চে তার অবস্থানকে শক্তিশালী করার লক্ষ্যে গৃহীত হয়েছে। কিম জু আয়ের ভূমিকা ও উপস্থিতি ভবিষ্যতে উত্তর কোরিয়ার নীতি, নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক দিকগুলোতে কীভাবে প্রভাব ফেলবে, তা আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের দৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়াবে।



