কয়রা উপজেলার গবরা ঘাটাখালী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনে সকাল সাতটায় ভোটারদের দীর্ঘ লাইন দেখা গেল। ৭০ বছর বয়সী মুদিদোকানি আবদুর রাজ্জাক, যিনি ১৯৭১ সালের পর থেকে ভোটার, প্রথমবারের মতো তাড়াতাড়ি ভোট দিতে উপস্থিত হন। তিনি এক পায়ে ভার দিয়ে চলতে বাধ্য হলেও, ভোটের প্রতি তার উদ্দীপনা দৃঢ়, এবং তিনি হাসিমুখে বললেন, ‘বহু বছর পর ভোট দিলাম, মনে হচ্ছে আমি একেবারে নতুন ভোটার’।
আবদুর রাজ্জাকের বাড়ি কয়রা সদর ইউনিয়নের গবরা গ্রামে, এবং তিনি দেশের স্বাধীনতা অর্জনের পর থেকেই নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী। আজকের ভোটদান তার জন্য বিশেষ, কারণ তিনি কখনো এত তাড়াতাড়ি ভোটকেন্দ্রে আসেননি। সকাল সাতটায় পৌঁছে তিনি আশা করেন প্রথমে ভোট দিয়ে ফিরে যাবেন, তবে তার সামনে লম্বা সারি দেখে অন্য ভোটাররা তার বয়স ও শারীরিক অবস্থার কথা বিবেচনা করে তাকে অগ্রাধিকার দিয়ে ভোট দিতে সহায়তা করেন।
গবরা ঘাটাখালী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দুটি ভবনে ভোট গ্রহণ চলছে; একটি ভবন পুরুষ ভোটারদের জন্য এবং অন্যটি নারীদের জন্য নির্ধারিত। সকাল সাড়ে সাতটায় দু’পাশেই দীর্ঘ লাইন দেখা যায়। পোলিং এজেন্টরা ভোটারদের পরিচয়পত্র যাচাই করে দুইটি ব্যালট পেপার প্রদান করেন—একটি সাধারণ ভোটের এবং অন্যটি প্রার্থীদের প্রতীকসহ। দুইটি ব্যালটে ভোট দিতে সময় বেশি লাগায়, ফলে ভোটারদের মধ্যে ধৈর্যের পরীক্ষা দেখা যায়।
গবরা গ্রামের আরেক ভোটার, মোমেনা খাতুন, নাতি সঙ্গে নিয়ে ভোটকেন্দ্রে গিয়েছিলেন। তিনি ভেবেছিলেন সকালবেলা হলে ভিড় কম থাকবে, কিন্তু পৌঁছে দেখলেন ইতিমধ্যে অনেক মানুষ উপস্থিত। তিনি মন্তব্য করেন, ‘ভাবছিলাম ফাঁকা পামু। কিন্তু দেখি আমাদের আগেই অনেক মানুষ আইছে।’ তার কথায় ভোটের প্রতি জনগণের উচ্চ আগ্রহ প্রকাশ পায়।
এই ভোটদান প্রক্রিয়া খুলনা-৬ আসনে চলছে, যা সুন্দরবন সংলগ্ন কয়রা ও পাইকগাছা উপজেলা নিয়ে গঠিত এবং দেশের বৃহত্তম সংসদীয় আসনগুলোর একটি। এই আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ৪,২৩,৩৩১, এবং ১৫৫টি কেন্দ্রে ভোট গ্রহণ করা হচ্ছে। বর্তমান নির্বাচনে পাঁচজন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন: বিএনপির এস এম মনিরুল হাসান বাপ্পি (ধানের শীষ), জামায়াত-এ-ইসলামির আবুল কালাম আজাদ (দাঁড়িপাল্লা), জাতীয় পার্টির মোস্তফা কামাল জাহাঙ্গীর (লাঙ্গল), ইসলামি আন্দোলন বাংলাদেশের আসাদুল্লাহ আল গালিব (হাতপাখা) এবং বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির প্রশান্ত কুমার মণ্ডল (কাস্তে)।
সকাল সাড়ে আটটার দিকে খুলনা-৬ আসনের আরেকটি ভোটকেন্দ্র, মদিনানাবাদ মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে, একই রকম দীর্ঘ সারি দেখা যায়। ভোটাররা ভোটকেন্দ্রের প্রবেশদ্বার অতিক্রমের আগে রাস্তার পাশে অপেক্ষা করে, যা নির্বাচনের তীব্রতা ও জনগণের অংশগ্রহণের মাত্রা স্পষ্ট করে। এই পরিস্থিতি নির্বাচনী প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও সময়মতো সম্পন্ন হওয়ার জন্য প্রশাসনের প্রস্তুতি ও সমন্বয়ের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে।
ভোটদান চলাকালীন সময়ে ভোটারদের শারীরিক অবস্থা ও বয়সের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেওয়া হয়েছে, যা ভোটারদের অধিকার রক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। এছাড়া, দুইটি ব্যালট পেপার প্রদান প্রক্রিয়া ভোটারদের জন্য অতিরিক্ত সময়সাপেক্ষ হলেও, এটি ভোটের গোপনীয়তা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজনীয়।
এই ভোটদান প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ফলাফল প্রকাশের জন্য প্রস্তুতি নেওয়া হবে, এবং নির্বাচনের ফলাফল খুলনা-৬ আসনের রাজনৈতিক গতিপথে প্রভাব ফেলবে বলে বিশ্লেষকরা প্রত্যাশা করছেন। ভোটারদের উচ্চ উপস্থিতি এবং বিভিন্ন বয়সের মানুষদের সক্রিয় অংশগ্রহণ দেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার শক্তি ও স্বাস্থ্যের প্রতিফলন।



