১৩তম জাতীয় সংসদীয় নির্বাচনের প্রস্তুতি চলার সঙ্গে সঙ্গে, রাজধানী ঢাকা আবারও দেশের রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে বিশ্লেষকরা সতর্ক করছেন। রাজধানীর ভোটের ফলাফল যদি কোনো দলকে অধিকাংশ দেয়, তবে ঐ দলকে সরকার গঠন করার সম্ভাবনা বাড়ে।
১৯৯০-এর দশকের গণআন্দোলনের পর থেকে, ঢাকা নির্বাচনের ফলাফল প্রায়শই জাতীয় ম্যান্ডেটের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়েছে। ১৯৯১ সালের পঞ্চম জাতীয় সংসদীয় নির্বাচনে, বিএনপি ঢাকা জেলায় সব ১৩টি আসন জয় করে সরকার গঠন করে। ১৯৯৬ সালের জুনে, আওয়ামী লীগ ১৩টির মধ্যে আটটি আসন জয় করে, আর বিএনপি পাঁচটি জয় করে, ফলে ২১ বছর পর আবার ক্ষমতায় ফিরে আসে। ২০০১ সালে, বিএনপি-নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট আবার সব ১৩টি আসন জয় করে সরকার গঠন করে।
২০০৮ সালে নির্বাচনী সীমানা পুনর্বিন্যাসের ফলে ঢাকা জেলায় আসনের সংখ্যা ১৩ থেকে ২০-এ বৃদ্ধি পায়। একই বছরে অনুষ্ঠিত নবম জাতীয় সংসদীয় নির্বাচনে, আওয়ামী লীগ ২০টির মধ্যে ১৮টি আসন জয় করে তার জোটকে শাসনক্ষম করে তুলেছে। এই ধারাবাহিকতা দেখায় যে, রাজধানীর ভোটের প্রবণতা দেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক পরিবেশের প্রতিফলন হিসেবে কাজ করে।
বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন, ঢাকা ভোটের প্রভাব মূলত মানসিক। গ্রামীণ ভোটাররা প্রায়শই রাজধানী থেকে আসা “রাজনৈতিক বাতাস”-এর প্রতি সংবেদনশীল হয়ে থাকে। দেশের প্রশাসনিক ও বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসেবে ঢাকা নির্বাচনের ফলাফলকে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক ও কূটনীতিকদের কাছেও বিশেষ গুরুত্ব দেয়। তাই রাজধানী জয় করা কোনো দলের জন্য আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির দিকেও ইতিবাচক সংকেত বহন করে।
বদিয়ুল আলম মজুমদার, নির্বাচন সংস্কার কমিশনের প্রধান ও শুজানের সচিব, উল্লেখ করেন, “ধাকার বাসিন্দা সব জেলা থেকে আসা মানুষ নিয়ে গঠিত, তাই শহরের রাজনৈতিক মনোভাব জাতীয় মানসিকতার প্রতিফলন ঘটায়। কোনো দল যদি ঢাকা জয় করে, তা দেশের ব্যাপক সমর্থন নির্দেশ করে।”
বর্তমান নির্বাচনী পরিবেশে, আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতি কারণে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বিতা বিএনপি ও জামাত-ই-ইসলাম নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় জোটের মধ্যে কেন্দ্রীভূত হয়েছে। বিএনপি ঢাকা জেলায় পুনরায় আধিপত্য পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে চায়, আর জামাত ও তার জোট, পাশাপাশি ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি (এনসিপি), বিএনপির ভোটভিত্তি হ্রাসের লক্ষ্যে কাজ করছে।
অনেক নির্বাচনী এলাকায় মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা বিএনপির “শস্যের গুচ্ছ” এবং জামাতের প্রার্থী মধ্যে গড়ে উঠছে। উভয় দিকই ভোটারদের মনোযোগ আকর্ষণ করতে স্থানীয় উন্নয়ন, অবকাঠামো ও কর্মসংস্থান সংক্রান্ত প্রতিশ্রুতি তুলে ধরছে। তবে, রাজধানীর ভোটের ফলাফল কীভাবে গড়ে উঠবে, তা দেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক দৃশ্যপটের জন্য নির্ধারক হবে।
ধাকার ফলাফল যদি কোনো দলকে স্পষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠতা দেয়, তবে তা জাতীয় স্তরে ঐ দলের সমর্থনকে শক্তিশালী করে তুলবে এবং সরকার গঠনের প্রক্রিয়াকে সহজ করবে। অন্যদিকে, যদি ফলাফল বিভক্ত হয়, তবে জোট গঠন বা মাইনরিটিতে শাসন চালানোর সম্ভাবনা বাড়বে। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা এই ফলাফলকে দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার সূচক হিসেবে বিবেচনা করবে।
সারসংক্ষেপে, ১৩তম সংসদীয় নির্বাচনের আগে ঢাকা আবারও “ঢাকা ফ্যাক্টর” নামে পরিচিত রাজনৈতিক সূচক হিসেবে উন্মোচিত হচ্ছে। ভোটের প্রবাহ, জোটের গঠন ও পার্টির কৌশল সবই এই রাজধানীর নির্বাচনী গতিবিধির ওপর নির্ভরশীল। তাই, দেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণে ঢাকা ভোটের ফলাফলকে নজরদারির দৃষ্টিতে দেখা উচিত।



