পৃথিবীর গহ্বরের গভীরতম স্তরে বিশাল পরিমাণ হাইড্রোজেন লুকিয়ে থাকতে পারে, এমন নতুন গবেষণার ফলাফল সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে। বিজ্ঞানীরা অনুমান করছেন যে এই হাইড্রোজেনের মোট আয়তন পৃথিবীর সমুদ্রের দশকোডি সমান হতে পারে। এই তথ্য সাইন্স নিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, পৃথিবীর গঠন ও চৌম্বকীয় ক্ষেত্রের ওপর নতুন দৃষ্টিভঙ্গি এনে দিতে পারে।
গবেষণাটি আন্তর্জাতিক দল দ্বারা পরিচালিত হয়েছিল, যেখানে ভূকম্পন বিশ্লেষণ এবং উচ্চচাপ পরীক্ষার ফলাফল একত্রিত করা হয়েছে। ভূকম্পন ডেটা থেকে প্রাপ্ত তথ্য দেখায় যে কেন্দ্রীয় অংশে অস্বাভাবিক ঘনত্বের পরিবর্তন রয়েছে, যা হাইড্রোজেনের উপস্থিতি নির্দেশ করে। একই সঙ্গে ল্যাবরেটরিতে লোহা-হাইড্রোজেন মিশ্রণকে পৃথিবীর কেন্দ্রীয় চাপে পুনরায় তৈরি করা হয়েছে।
পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশ করে যে লোহা ও হাইড্রোজেনের সংমিশ্রণ উচ্চচাপে স্থিতিশীল থাকে এবং বড় পরিমাণে হাইড্রোজেনকে শোষণ করতে পারে। এই শোষণ প্রক্রিয়া কেন্দ্রীয় অংশের ঘনত্ব হ্রাসের একটি সম্ভাব্য ব্যাখ্যা প্রদান করে। গবেষকরা অনুমান করেন যে হাইড্রোজেনের এই সঞ্চয় পৃথিবীর গঠনকালীন সময়ে গ্যাসীয় অবস্থায় যুক্ত হয়ে পরে কঠিন রূপে রূপান্তরিত হয়েছে।
গণনা অনুযায়ী, হাইড্রোজেনের মোট আয়তন প্রায় ১০০ থেকে ২০০ গুণ সমুদ্রের পানির সমান হতে পারে, যা প্রায় একশো থেকে দুইশো সমুদ্রের সমান। যদিও হাইড্রোজেনের ঘনত্ব তরল পানির তুলনায় কম, তবে তার বিশাল পরিমাণের কারণে মোট ভলিউম উল্লেখযোগ্য। এই পরিমাণের হাইড্রোজেন পৃথিবীর মোট ভরেও প্রভাব ফেলতে পারে।
হাইড্রোজেনের সংরক্ষণ পদ্ধতি মূলত লোহা-নিকেল মিশ্রণে ঘটে, যেখানে হাইড্রোজেন অণু লোহা অণুর মধ্যে ফাঁকা জায়গায় আটকে থাকে। এই প্রক্রিয়াকে ‘হাইড্রোজেন সোলিউশন’ বলা হয় এবং উচ্চচাপে এটি স্থিতিশীল থাকে। গবেষকরা উল্লেখ করেন যে এই ধরনের সোলিউশন পৃথিবীর কেন্দ্রে দীর্ঘ সময় ধরে বজায় থাকতে পারে।
এই ফলাফল পৃথিবীর গঠন তত্ত্বে নতুন প্রশ্ন উত্থাপন করে। যদি হাইড্রোজেনের এত বড় সঞ্চয় থাকে, তবে তা গ্রহের প্রাথমিক গ্যাসীয় স্তর এবং পরবর্তীতে কঠিন স্তরে রূপান্তরের প্রক্রিয়াকে পুনরায় ব্যাখ্যা করতে পারে। এছাড়া, হাইড্রোজেনের উপস্থিতি গ্রহের চৌম্বকীয় ক্ষেত্রের উৎপাদনে ভূমিকা রাখতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
চৌম্বকীয় ক্ষেত্রের উৎপাদন প্রক্রিয়ায় তরল লোহা-নিকেল মিশ্রণ গুরুত্বপূর্ণ, এবং হাইড্রোজেনের উপস্থিতি এই মিশ্রণের বৈদ্যুতিক পরিবাহিতা ও তরলত্বকে প্রভাবিত করতে পারে। গবেষকরা অনুমান করছেন যে হাইড্রোজেনের উপস্থিতি চৌম্বকীয় ক্ষেত্রের শক্তি ও স্থিতিশীলতাকে সমর্থন করতে পারে, যদিও সুনির্দিষ্ট প্রভাব এখনও গবেষণার বিষয়।
ম্যান্টল এবং কোরের মধ্যে তাপ স্থানান্তরের গতিবিদ্যাও হাইড্রোজেনের সঞ্চয়ের ফলে পরিবর্তিত হতে পারে। হাইড্রোজেনের কম ঘনত্বের কারণে তাপের পরিবহন হার বাড়তে পারে, যা গ্রহের অভ্যন্তরীণ তাপ প্রবাহের মডেলকে সামান্য পরিবর্তন করতে পারে। এই দিকটি ভবিষ্যৎ ভূ-তাপীয় গবেষণার জন্য গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা দেবে।
বৈশ্বিক বৈজ্ঞানিক সম্প্রদায় এই ফলাফলকে সতর্ক আশাবাদে গ্রহণ করেছে। বেশ কয়েকটি স্বতন্ত্র গবেষণা দল একই ধরনের পদ্ধতি ব্যবহার করে সমর্থনমূলক ডেটা সংগ্রহের পরিকল্পনা করেছে। যদিও হাইড্রোজেনের সুনির্দিষ্ট পরিমাণ এখনও অনুমানসাপেক্ষ, তবে বর্তমান ফলাফল গৃহীত মডেলকে পুনর্বিবেচনা করার প্রয়োজনীয়তা নির্দেশ করে।
ভবিষ্যৎ গবেষণায় আরও সুনির্দিষ্ট ভূকম্পন মাপ এবং উচ্চচাপ ল্যাবরেটরি পরীক্ষা অন্তর্ভুক্ত হবে, যাতে হাইড্রোজেনের বণ্টন ও অবস্থান নির্ধারণ করা যায়। এছাড়া, গ্রহের গঠনকালীন সময়ে হাইড্রোজেনের ভূমিকা বোঝার জন্য মহাকাশীয় রকেটের নমুনা বিশ্লেষণও পরিকল্পনা করা হয়েছে।
এই নতুন আবিষ্কার আমাদের গ্রহের গোপনীয়তা উন্মোচনের পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। হাইড্রোজেনের বিশাল সঞ্চয় কীভাবে পৃথিবীর দীর্ঘমেয়াদী স্থিতিশীলতা ও পরিবেশকে প্রভাবিত করে, তা নিয়ে গবেষণা অব্যাহত থাকবে। পাঠকরা কি এই সম্ভাব্য হাইড্রোজেন সমুদ্রের প্রভাব সম্পর্কে আরও জানতে চান?



