গতকাল বুধবার পূর্ব ইউক্রেনের বোহোদুখিভে রাশিয়ান ড্রোনের আক্রমণে একটি পরিবারকে লক্ষ্য করে মারাত্মক ক্ষতি হয়েছে। তিনটি শিশুর জীবন এবং তাদের ৩৪ বছর বয়সী পিতা গ্রিহরিও নিহত হয়েছেন। এই ঘটনার স্থান ও সময় স্পষ্ট, এবং এটি চলমান সংঘর্ষের নতুন এক দুঃখজনক উদাহরণ।
খারকিভ অঞ্চলের গভর্নর ওলেগ সিনেগুবভের তথ্য অনুযায়ী, পরিবারটি আগের দিন খারকিভ থেকে প্রায় ৬০ কিলোমিটার পশ্চিমে অবস্থিত বোহোদুখিভে নিরাপত্তার সন্ধানে গিয়েছিল। তারা জোলচিভ থেকে রাশিয়ান ধারাবাহিক গোলাবর্ষণ থেকে বাঁচতে বেরিয়ে এসেছিল এবং বোহোদুখিভে তাদের প্রথম রাতই এই আক্রমণের শিকার হয়।
হত্যার শিকার তিন শিশুর মধ্যে রয়েছে দুই যমজ ছেলে—ইভান ও ভ্লাদিস্লাভ—এবং এক বছর বয়সী মেয়ে মিরোস্লাভা। তাদের বাবা গ্রিহরিও, যিনি পরিবারকে নিরাপদে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছিলেন, ড্রোনের বিস্ফোরণে প্রাণ হারিয়ে যান। পরিবারটির এই ট্র্যাজেডি স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।
বোহোদুখিভের পাশাপাশি জোলচিভে আরেকটি ড্রোন হামলায় দুই কিশোরী কিশোরী আহত হয়েছেন, এবং গর্ভবতী এক মহিলার মাথায় আঘাত লেগেছে। এই ঘটনাগুলি দেখায় যে একই সময়ে একাধিক এলাকায় বেসামরিক নাগরিকদের ওপর আক্রমণ চালানো হচ্ছে, যা মানবিক সংকটকে আরও তীব্র করে তুলছে।
বোহোদুখিভের মেয়র ভ্লাদিমির বেলি এই হামলাকে “মানবিকভাবে অগ্রহণযোগ্য” বলে শোক প্রকাশ করেছেন এবং উল্লেখ করেছেন, “আমরা আমাদের সবচেয়ে মূল্যবান ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে হারিয়েছি।” তার এই মন্তব্য স্থানীয় জনগণের শোক ও রাগকে প্রতিফলিত করে।
ইউক্রেনের রাষ্ট্রপতি ভ্লাদিমির জেলেনস্কি ঘটনাটিকে রাশিয়ার শান্তি প্রতিষ্ঠার অপ্রামাণিকতার প্রমাণ হিসেবে উল্লেখ করে, “এই হামলা প্রমাণ করে রাশিয়া কখনও শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রতি আন্তরিক নয়।” তিনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে রাশিয়ার নীতি পরিবর্তনের আহ্বান জানিয়েছেন।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিদেশ নীতি প্রধান এবং যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় উভয়ই এই আক্রমণকে আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের লঙ্ঘন হিসেবে নিন্দা করেছে। জাতিসংঘের সেক্রেটারি-জেনারেলও বেসামরিক নাগরিকের ক্ষতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে, এবং রাশিয়ার বিরুদ্ধে অতিরিক্ত নিষেধাজ্ঞা আরোপের সম্ভাবনা উল্লেখ করেছেন। এই ধরনের আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া ইউক্রেনের নিরাপত্তা চাহিদা ও শান্তি প্রক্রিয়ার ওপর চাপ বাড়াতে পারে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, বোহোদুখিভে ঘটিত এই ট্র্যাজেডি সংঘর্ষের তীব্রতা বাড়িয়ে তুলবে এবং শরণার্থী প্রবাহকে আরও বাড়িয়ে দেবে। ড্রোনের ব্যবহার এবং বেসামরিক এলাকায় আক্রমণ আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক আলোচনার নতুন বিষয় হয়ে উঠতে পারে, বিশেষ করে ইউরোপীয় নিরাপত্তা ও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সমাধান নিয়ে চলমান আলোচনায়। পরবর্তী সপ্তাহে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে এই ধরনের আক্রমণ নিয়ে বিশেষ সেশন অনুষ্ঠিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, যা রাশিয়ার বিরুদ্ধে অতিরিক্ত রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পদক্ষেপের ভিত্তি তৈরি করতে পারে।
এই ঘটনার পর ইউক্রেনের সরকার নিরাপত্তা ব্যবস্থা শক্তিশালী করার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সহায়তা ও মানবিক সাহায্য ত্বরান্বিত করার দাবি জানিয়েছে। বোহোদুখিভে এবং আশেপাশের অঞ্চলে বেসামরিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা, শরণার্থীদের জন্য অস্থায়ী আশ্রয় প্রদান এবং চিকিৎসা সেবা দ্রুত সরবরাহ করা এখন অগ্রাধিকার। একই সঙ্গে, রাশিয়ার সঙ্গে চলমান কূটনৈতিক সংলাপের প্রেক্ষাপটে এই ধরনের হামলা কূটনৈতিক সমঝোতার পথে বাধা সৃষ্টি করতে পারে, যা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমন্বিত প্রতিক্রিয়া প্রয়োজন।



