কাজাখস্তানের সরকার ১৫ মার্চ নতুন মৌলিক আইনের অনুমোদনের জন্য গণভোটের আয়োজনের সিদ্ধান্ত জানিয়েছে। এই ভোটের মাধ্যমে দেশের নাগরিকরা সংবিধানিক পরিবর্তনের অনুমোদন বা প্রত্যাখ্যানের সুযোগ পাবেন। ভোটের আয়োজনের পেছনে প্রেসিডেন্ট কাসিম‑জোমার্ট তোকায়েভের শাসনকাল দীর্ঘায়িত করার সম্ভাবনা উল্লেখ করা হয়েছে।
সংবিধান পাস হলে তোকায়েভ ২০২৯ সালের পরেও রাষ্ট্রের শীর্ষে থাকবেন, যদিও বর্তমান সংবিধানে ২০২৯‑এর পর শাসনকাল বাড়ানোর কোনো বিধান নেই। নতুন খসড়া অনুযায়ী প্রেসিডেন্টের মেয়াদ একবারের জন্য সাত বছর সীমাবদ্ধ থাকবে, তবে পূর্ববর্তী মেয়াদটি বাতিল বলে গণ্য করা হতে পারে। ফলে তোকায়েভ পুনরায় নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ পেতে পারেন।
সংবিধানের মূল পরিবর্তনগুলোর মধ্যে পার্লামেন্টের দ্বিকক্ষীয় কাঠামোকে এককক্ষীয় করে রূপান্তর, সংসদ সদস্যসংখ্যা হ্রাস, এবং ১৯৯৬ সালে বিলুপ্ত হওয়া ভাইস প্রেসিডেন্টের পদ পুনঃপ্রতিষ্ঠা অন্তর্ভুক্ত। এছাড়া আইনপ্রণেতা সংখ্যালঘু সংখ্যা কমিয়ে কার্যকরী সিদ্ধান্ত গ্রহণের গতি বাড়ানোর লক্ষ্য রাখা হয়েছে। মেয়াদ সীমা সংক্রান্ত ধারাটি একই রকম রেখে, একক মেয়াদে সাত বছরের সীমা বজায় রাখা হয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা উল্লেখ করছেন, যদি নতুন সংবিধান অনুমোদিত হয়, তবে তোকায়েভের বর্তমান মেয়াদটি পূর্বের সংবিধানের অধীনে থাকা হিসেবে রদ করা হতে পারে, ফলে তিনি আবার নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে পারবেন। এই ব্যাখ্যা তোকায়েভের শাসনকাল বাড়ানোর সম্ভাবনাকে সমর্থন করে। তবে বিশ্লেষকরা সতর্ক করছেন, এই ধরনের ব্যাখ্যা দেশের সংবিধানিক স্থিতিশীলতায় প্রশ্ন তুলতে পারে।
কাজাখস্তানের এই পদক্ষেপ রাশিয়া, বেলারুশ এবং উজবেকিস্তানের নেতাদের সাম্প্রতিক সংবিধান সংশোধনের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ, যেখানে প্রত্যেকেই নিজেদের শাসনকাল পুনর্নির্ধারণের জন্য আইনি কাঠামো পরিবর্তন করেছে। এই দেশগুলোতে একই ধরনের সংবিধানিক পরিবর্তন নির্বাচনী সময়সীমা বাড়ানোর জন্য ব্যবহৃত হয়েছে। তাই আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা কাজাখস্তানের এই গণভোটকে অঞ্চলের রাজনৈতিক প্রবণতার অংশ হিসেবে বিশ্লেষণ করছেন।
গণভোটের সময় দেশটি উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি ও কর বৃদ্ধি সহ কঠিন অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবের ফলে জ্বালানি দামের উত্থান এবং বাণিজ্যিক চাপ বাড়ার ফলে মূল্যস্ফীতি শীর্ষে পৌঁছেছে। সরকার এই পরিস্থিতিতে আর্থিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে নতুন নীতি প্রণয়নের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছে।
প্রেসিডেন্ট তোকায়েভ ২০১৯ সালে নূরসুলতান নাজারবায়েভের উত্তরসূরি হিসেবে ক্ষমতায় আসেন। প্রথমে নাজারবায়েভের প্রভাবের অধীনে কাজ করলেও, ২০২২ সালের দাঙ্গার পর তোকায়েভ তার পূর্বসূরির বেশিরভাগ ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেন। এরপর থেকে তিনি স্বাধীনভাবে দেশের অভ্যন্তরীণ ও বহিরাগত নীতি নির্ধারণে সক্রিয় ভূমিকা পালন করছেন।
কাজাখস্তান বিশ্ব তেলের প্রায় দুই শতাংশ উৎপাদনকারী দেশ, যা তাকে পশ্চিমা দেশ, রাশিয়া এবং চীনের সঙ্গে কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক বজায় রাখতে সহায়তা করে। তেল রপ্তানি দেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি, ফলে আন্তর্জাতিক বাজারের ওঠা-নামার সঙ্গে দেশের আর্থিক অবস্থা সরাসরি যুক্ত। বর্তমান সময়ে তোকায়েভের সরকার এই সম্পদকে ব্যবহার করে বহুমুখী কূটনৈতিক ভারসাম্য রক্ষা করার চেষ্টা করছে।
রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, নতুন সংবিধানের অধীনে তোকায়েভের পুনরায় ক্ষমতায় আসার সম্ভাবনা রয়েছে, তবে এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। গণভোটের ফলাফল দেশের রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।



