বৃহস্পতিবার লোকসভা সভায় বিরোধী দলীয় নেতা রাহুল গান্ধী সরকারের নীতি সম্পর্কে তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি উল্লেখ করেন, বর্তমান কেন্দ্রীয় সরকার ভারতের স্বার্থকে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে হস্তান্তর করেছে এবং দেশের কৃষক ও জ্বালানি নিরাপত্তাকে ঝুঁকির মুখে ফেলেছে। এই মন্তব্যের পটভূমিতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্প্রতি ঘোষিত বাণিজ্যিক চুক্তি এবং তার প্রভাব রয়েছে।
গান্ধী বলেন, যদি বিরোধী জোটের শাসন ক্ষমতায় থাকত, তবে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক আলোচনায় সমমর্যাদার প্রশ্নে আপস করা হতো না। তবে বর্তমান সরকার দেশের মাটিতে আমেরিকান পণ্যের প্রবেশকে স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ করে দিয়েছে, যা কৃষকদের জীবিকাকে হুমকির মুখে ফেলেছে। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীলতা বাড়িয়ে জ্বালানি নিরাপত্তা বন্ধক দেওয়ার কথাও উল্লেখ করেন।
এই বক্তব্যের পর তিনি বর্তমান শাসনকে “বিস্তৃত আত্মসমর্পণ” হিসেবে চিহ্নিত করেন। রাহুলের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের পণ্য ও প্রযুক্তি প্রবেশের মাধ্যমে দেশের স্বনির্ভরতা ক্ষয়প্রাপ্ত হচ্ছে এবং তা দীর্ঘমেয়াদে জাতির স্বার্থের ক্ষতি করবে।
বাজেট প্রস্তাবের উপর বিতর্কের সময় রাহুলের মন্তব্যের পর ট্রেজারি বেঞ্চ থেকে বাধা দেওয়া হয়, যা পূর্বের মতই তীব্র বিরোধের ইঙ্গিত দেয়। তিনি তৎকালীন অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারমণীর বাজেট প্রস্তাবের সমালোচনা করে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তির প্রভাব তুলে ধরেন।
কংগ্রেসের একজন সদস্য রায়বরেলীর মন্তব্যে বলেন, প্রধানমন্ত্রী মোদি যুক্তরাষ্ট্রের চাপের মুখে ভারতকে বিক্রি করেছেন, কারণ আমেরিকানরা দেশের শ্বাসরোধের চেষ্টা করছে। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীলতা বাড়ার ফলে দেশের স্বাধীনতা হ্রাস পাচ্ছে বলে ইঙ্গিত করেন।
গান্ধী মার্শাল আর্টের উদাহরণ দিয়ে তার যুক্তি সমর্থন করেন। তিনি বলেন, কিছু মার্শাল আর্টে প্রতিপক্ষকে শ্বাসরোধের জন্য ঘাড় চেপে ধরা হয়, যা তিনি বর্তমান আন্তর্জাতিক চাপের সঙ্গে তুলনা করেন। এ প্রসঙ্গে তিনি এপস্টেইন ফাইলের উল্লেখ করে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ সমস্যার দিকে ইঙ্গিত করেন।
প্রেক্ষাপট হিসেবে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ২ ফেব্রুয়ারি ভারত সঙ্গে বাণিজ্যিক সমঝোতা ঘোষণা করেন। এতে শুল্কের হার ২৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৮ শতাংশ করা হয় এবং রাশিয়া থেকে তেল ক্রয়ের উপর আরোপিত ২৫ শতাংশ জরিমানা প্রত্যাহার করা হয়। এই চুক্তির অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র ভারতকে ৫০,০০০ কোটি ডলারের বেশি মূল্যের জ্বালানি, প্রযুক্তি, কৃষি, কয়লা এবং অন্যান্য পণ্য সরবরাহের প্রতিশ্রুতি দেয়।
চুক্তির শর্তে উল্লেখিত বড় পরিমাণের ক্রয় পরিকল্পনা ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে কিছু বিশেষজ্ঞের মতামত রয়েছে। বিশেষ করে ইউক্রেন যুদ্ধের পর রাশিয়া থেকে তেল ক্রয়কে ভারতের প্রধান জ্বালানি উৎস হিসেবে বিবেচনা করা হয়, তাই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এই চুক্তি জ্বালানি নীতিতে পরিবর্তন আনতে পারে।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, এই বাণিজ্যিক সমঝোতার অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি ও দুগ্ধজাত পণ্যের জন্য ভারতের বাজারে আংশিকভাবে দরজা খুলে দেওয়া হবে। এর ফলে দেশীয় কৃষকদের প্রতিযোগিতা বাড়বে এবং বাজারের গঠন পরিবর্তিত হতে পারে।
উল্লেখিত তথ্যের সূত্র হিসেবে ইন্ডিয়া টুডে, দ্য প্রিন্ট এবং টাইমস অব ইন্ডিয়া উল্লেখ করা হয়েছে। এই মিডিয়া প্রতিষ্ঠানগুলো চুক্তির মূল শর্ত এবং রাহুলের মন্তব্যের বিশদ বিবরণ প্রদান করেছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা অনুমান করছেন, রাহুলের এই মন্তব্য এবং বিরোধী দলের তীব্র সমালোচনা সরকারকে বাণিজ্যিক চুক্তির বাস্তবায়ন ও জনমত গঠন নিয়ে কঠিন অবস্থায় ফেলতে পারে। পরবর্তী সপ্তাহে বাজেটের বাস্তবায়ন এবং যুক্তরাষ্ট্রের পণ্য প্রবেশের ওপর নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি সংসদে তীব্র বিতর্কের বিষয় হতে পারে।



