পৃথিবীর অভ্যন্তরীণ গঠন নিয়ে নতুন গবেষণায় দেখা গেছে, গৃহের কেন্দ্রের গভীর অংশে হাইড্রোজেনের তরল সমুদ্রের সম্ভাবনা রয়েছে। গবেষকরা অনুমান করছেন, এই তরল স্তরগুলো একাধিক সমুদ্রের সমান পরিমাণে হতে পারে, যা পূর্বের ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করে।
এই ফলাফলটি আন্তর্জাতিক জ্যোতির্বিদ্যা ও ভূবিজ্ঞান দল ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে প্রকাশিত একটি গবেষণাপত্রে উপস্থাপন করেছে। গবেষণার মূল লক্ষ্য ছিল পৃথিবীর কোরের চাপে হাইড্রোজেনের আচরণ বিশ্লেষণ করা, যাতে গঠনগত মডেলগুলোকে আরও সঠিক করা যায়।
বৈজ্ঞানিক দল উচ্চচাপের ল্যাবরেটরি পরীক্ষার মাধ্যমে হাইড্রোজেনকে এমন অবস্থায় রাখে, যেখানে তা পৃথিবীর কোরের চাপে থাকে। পরীক্ষায় দেখা গেছে, চরম চাপের অধীনে হাইড্রোজেন তরল অবস্থায় রূপান্তরিত হয় এবং তার ঘনত্ব বৃদ্ধি পায়, যা কোরের ঘনত্বের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
সেই সঙ্গে, সিসমিক তরঙ্গের বিশ্লেষণ ব্যবহার করে ভূকম্পনের ডেটা পুনরায় পরীক্ষা করা হয়। সিসমিক তরঙ্গের গতি ও দিক পরিবর্তন হাইড্রোজেনের উপস্থিতি নির্দেশ করে, কারণ তরল হাইড্রোজেন সিসমিক তরঙ্গকে ধীর করে। এই পদ্ধতি পূর্বে পৃথিবীর ম্যান্টল ও কোরের গঠন নির্ণয়ে ব্যবহৃত হয়।
গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে, হাইড্রোজেনের তরল স্তরগুলো কোরের বাইরের অংশে, প্রায় ১,৫০০ কিলোমিটার গভীরতায় অবস্থিত হতে পারে। অনুমান অনুযায়ী, এই স্তরগুলো একসাথে দশেরও বেশি সমুদ্রের সমান পরিমাণ হাইড্রোজেন ধারণ করতে পারে। তবে সঠিক পরিমাণ নির্ধারণে এখনও কিছু অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।
বিশেষজ্ঞরা এই ফলাফলকে পৃথিবীর গঠনবিজ্ঞান ও ভূতাপীয় প্রক্রিয়ার নতুন দৃষ্টিকোণ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন। হাইড্রোজেনের উপস্থিতি কোরের তাপমাত্রা ও চৌম্বক ক্ষেত্রের গঠনকে প্রভাবিত করতে পারে, যা পৃথিবীর ভূচৌম্বকীয় পরিবর্তনের ব্যাখ্যায় সহায়তা করবে।
এছাড়া, হাইড্রোজেনের বৃহৎ পরিমাণে উপস্থিতি পৃথিবীর গঠনগত ইতিহাসে নতুন প্রশ্ন উত্থাপন করে। প্রাচীন সময়ে গ্রহের গঠন পর্যায়ে হাইড্রোজেন কীভাবে সঞ্চিত হয়েছে, এবং তা কি অন্য গ্রহের কোরেও একই রকম হতে পারে, তা এখন গবেষণার বিষয়।
গবেষণার সীমাবদ্ধতা উল্লেখ করা হয়েছে, কারণ সরাসরি কোরে হাইড্রোজেন মাপা সম্ভব নয়। তাই সব অনুমানই পরোক্ষ ডেটা ও মডেলের ওপর নির্ভরশীল। ভবিষ্যতে আরও উন্নত সিসমিক পর্যবেক্ষণ ও উচ্চচাপের পরীক্ষার মাধ্যমে এই অনুমানকে শক্তিশালী করা হবে।
এই গবেষণার ফলাফল সাইন্স নিউজ (সাইন্স নিউজ) তে প্রকাশিত হয়েছে এবং বৈশ্বিক বৈজ্ঞানিক সম্প্রদায়ের মধ্যে আলোচনার সূচনা করেছে। বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক জার্নাল এই ফলাফলকে উল্লেখ করেছে এবং পরবর্তী গবেষণার জন্য প্রস্তাবনা দিয়েছে।
প্রধান গবেষক দলের একজন বিজ্ঞানী উল্লেখ করেছেন, হাইড্রোজেনের তরল স্তরগুলো কোরের গঠনকে আরও নমনীয় করে তুলতে পারে, যা ভূকম্পনের তীব্রতা ও দিক পরিবর্তনে ভূমিকা রাখতে পারে। তবে তিনি সতর্ক করেছেন, বর্তমান মডেলগুলো এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে, এবং অতিরিক্ত ডেটা প্রয়োজন।
এই নতুন ধারণা পৃথিবীর অভ্যন্তরীণ গঠনকে পুনরায় মূল্যায়নের দরকারীয়তা তুলে ধরে। যদি হাইড্রোজেনের সমুদ্র সত্যিই বিদ্যমান হয়, তবে তা কোরের ঘনত্ব, তাপ পরিবহন এবং চৌম্বক ক্ষেত্রের গতিবিদ্যায় গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।
অবশেষে, বিজ্ঞানীরা ভবিষ্যতে আরও সূক্ষ্ম সিসমিক নেটওয়ার্ক এবং উচ্চচাপের ল্যাবরেটরি পরীক্ষা চালিয়ে হাইড্রোজেনের প্রকৃত পরিমাণ ও বিতরণ নির্ণয় করার পরিকল্পনা করছেন। এই গবেষণা পৃথিবীর গঠনবিজ্ঞানকে সমৃদ্ধ করতে এবং অন্যান্য গ্রহের কোরের তুলনায় নতুন দৃষ্টিভঙ্গি প্রদান করতে পারে।
পাঠকদের জন্য প্রশ্ন রয়ে যায়: যদি পৃথিবীর কেন্দ্রে হাইড্রোজেনের বিশাল সমুদ্র থাকে, তবে তা আমাদের দৈনন্দিন জীবনে কীভাবে প্রভাব ফেলতে পারে, এবং ভবিষ্যতে এই জ্ঞানকে কীভাবে ব্যবহার করা যেতে পারে?



