ইরান সরকার তেহরানসহ দেশের প্রায় চৌদ্দশত শহর ও নগরে ৪৭তম ইসলামি বিপ্লবের বিজয় বার্ষিকী উদযাপনের জন্য বৃহৎ পদযাত্রা আয়োজন করে। বুধবার সকাল সাড়ে নয়টায় তেহরানের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে অংশগ্রহণকারীরা ঐতিহাসিক আজাদি স্কোয়ারের দিকে রওনা হয়। লক্ষ লক্ষ নাগরিক শীত, বৃষ্টি ও তুষারকে উপেক্ষা করে রাস্তায় নেমে জাতীয় ঐক্যের দৃঢ় বার্তা তুলে ধরে।
মহাপরিবেশে তীব্র শীতলতা এবং বৃষ্টিপাতের মাঝেও জনস্রোত বিশাল ভিড় গঠন করে, যা সাম্প্রতিক সপ্তাহে ইজরায়েলি সরকার ও মার্কিন সরকারের ধারাবাহিক হুমকি ও উস্কানির প্রতিক্রিয়া হিসেবে দেখা হচ্ছে। অংশগ্রহণকারীরা একসাথে শীতের কঠিন পরিস্থিতি অতিক্রম করে রাস্তায় উঠে দেশের স্বায়ত্তশাসন ও নিরাপত্তার পক্ষে দৃঢ় স্লোগান শোনায়।
পদযাত্রায় অংশগ্রহণকারী ভিড় দশকের পর দশক ধরে ইরানি জনগণের বিরুদ্ধে মার্কিন সরকারের ষড়যন্ত্র ও অপরাধের নিন্দা জানিয়ে স্লোগান তোলেন। একই সঙ্গে ইজরায়েলি সরকারের সামরিক নৃশংসতার বিরোধিতা করে প্রতিবাদসূচক স্লোগানও শোনা যায়। এই স্লোগানগুলো আন্তর্জাতিক মঞ্চে ইরানের স্বার্থ রক্ষার ইচ্ছা প্রকাশ করে।
আজাদি স্কোয়ারে বিশাল সমাবেশে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান গুরুত্বপূর্ণ ভাষণ দেন। তিনি দেশের স্বাধীনতা, স্বায়ত্তশাসন ও নিরাপত্তা রক্ষার জন্য জাতীয় ঐক্যের গুরুত্ব তুলে ধরে, পাশাপাশি বিদেশি হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে সতর্কতা জানান। তার ভাষণে ইরান সরকারের বর্তমান নীতি ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়।
সমাবেশের এক পাশে সাম্প্রতিক বিদেশি চক্রান্তে ক্ষতিগ্রস্ত বিভিন্ন যানবাহন ও সরঞ্জাম প্রদর্শিত হয়। এই প্রদর্শনীটি জনগণের মধ্যে ষড়যন্ত্রের বিপদ সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানোর উদ্দেশ্যে করা হয়েছে। প্রদর্শিত যানবাহনগুলোতে মার্কিন ও ইজরায়েলি সরকারের সমর্থিত আক্রমণের চিহ্ন স্পষ্টভাবে দেখা যায়।
আজাদি স্কোয়ারে ইরানের সামরিক শক্তির প্রতীক হিসেবে সুমার, নূর ও কাদির ক্রুজ মিসাইল পাশাপাশি জুলফিকার ও হাজ কাসেমের মতো ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রও প্রদর্শিত হয়। এই অস্ত্রগুলো দেশের প্রতিরক্ষা ক্ষমতা ও স্বনির্ভরতা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে বলে সরকার জোর দেয়।
গত জুনের যুদ্ধে ইজরায়েলি ড্রোনের ধ্বংসাবশেষও জনসাধারণের সামনে তুলে ধরা হয়। এই ধ্বংসাবশেষ ইরানের বায়ু প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার কার্যকারিতা ও যুদ্ধক্ষেত্রে অর্জিত সাফল্যকে চিত্রিত করে। প্রদর্শনীটি ইরান সরকারের আন্তর্জাতিক মঞ্চে শক্তিশালী প্রতিরক্ষা সক্ষমতা প্রদর্শনের একটি অংশ হিসেবে উপস্থাপিত হয়।
পদযাত্রা ও সমাবেশের সময় ইরান সরকারের নিরাপত্তা বাহিনীর কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থাও লক্ষ্য করা যায়। রাস্তায় নিরাপত্তা গার্ড, পুলিশ ও স্বেচ্ছাসেবকরা সমাবেশের শৃঙ্খলা বজায় রাখতে সক্রিয়ভাবে কাজ করেন। কোনো বিশৃঙ্খলা বা হিংসাত্মক ঘটনা রিপোর্ট করা হয়নি।
ইরান সরকারের এই বৃহৎ উদযাপন আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয়েছে। ইজরায়েলি সরকার ও মার্কিন সরকার উভয়ই তেহরানের এই পদযাত্রা সম্পর্কে মন্তব্য করে, তবে তাদের মন্তব্যের সুনির্দিষ্ট বিষয়বস্তু প্রকাশিত হয়নি। তবে উভয় পক্ষই ইরানের অভ্যন্তরীণ বিষয়ের প্রতি হস্তক্ষেপ না করার আহ্বান জানায়।
উল্লেখযোগ্য যে, এই পদযাত্রা ইরান সরকারের জন্য জাতীয় ঐক্যকে পুনরুজ্জীবিত করার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মঞ্চে তার স্বায়ত্তশাসন ও প্রতিরক্ষা নীতি জোরদার করার একটি কৌশলগত পদক্ষেপ। ভবিষ্যতে ইরান সরকার এই ধরনের বৃহৎ জনসমাবেশের মাধ্যমে দেশীয় সমর্থন শক্তিশালী করে, বিদেশি হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান বজায় রাখার পরিকল্পনা করছে।
বিশাল জনসমুদ্রের মাধ্যমে ইরান সরকার তার জনগণের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করে এবং আন্তর্জাতিক চাপের মুখে দেশের স্বার্থ রক্ষার সংকল্প পুনর্ব্যক্ত করে। এই ধরনের উদযাপন দেশের রাজনৈতিক দৃশ্যপটে স্থিতিশীলতা ও ঐক্যের প্রতীক হিসেবে কাজ করবে বলে বিশ্লেষকরা অনুমান করছেন।



