নির্বাচন কমিশন ৫৪ বছর পূর্ণ করেছে; দেশের রাজনৈতিক দৃশ্যপটে তার ভূমিকা কখনো প্রশংসা, কখনো নিন্দা পেয়েছে। প্রথমিক নির্বাচনগুলোতে কমিশনের সিদ্ধান্তগুলো সরকারী ইচ্ছার প্রতিফলন ছিল, আর সাম্প্রতিক সময়ে তার স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
স্বাধীনতার পরের দশকে, ১৯৭২ থেকে ১৯৯০ পর্যন্ত নির্বাচনগুলো মূলত আনুষ্ঠানিকতা হিসেবে দেখা হতো। সামরিক শাসন ও গণভোটের সীমিত সুযোগের কারণে জনগণের প্রকৃত ম্যান্ডেট প্রকাশ পায়নি। সেই সময়ের বিচারপতি ইদ্রিস ও বিচারপতি নূরুল ইসলাম নেতৃত্বে গঠিত কমিশনগুলো শাসকের ইচ্ছা অনুসারে কাজ করেছিল।
১৯৯১ সালে গণ-অভ্যুত্থানের পর ভোটাধিকারের স্বাদ ফিরে আসে। তত্ত্বাবধায়ক যুগে বিচারপতি আব্দুর রউফ (১৯৯১), বিচারপতি আবু হেনা (১৯৯৬) এবং এম এ সাঈদ (২০০১) নেতৃত্বে কমিশনগুলো দেখিয়েছে যে নির্বাহী শাখা নিরপেক্ষ থাকলে নির্বাচন কমিশন কতটা শক্তিশালী হতে পারে। বিশেষ করে ১৯৯৬ সালের নির্বাচন, যেখানে কোনো ভোটার তালিকা হালনাগাদ না করেও সফল নির্বাচন পরিচালিত হয়, তা আন্তর্জাতিক প্রশংসা অর্জন করে।
২০০৫ সালে বিচারপতি এম এ আজিজের সময়ে নির্বাচন কমিশনের ওপর প্রথম বড় সংকট দেখা দেয়। এক কোটি বিশ লাখেরও বেশি ভুয়া ভোটারের অভিযোগ উঠে, যা দেশের রাজনৈতিক পরিবেশকে ‘ওয়ান-ইলেভেন’ মডেলের দিকে ঠেলে দেয়। এই ঘটনা নির্বাচনী প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে ব্যাপক সন্দেহ সৃষ্টি করে।
কাজী রকিবউদ্দীন (২০১৪) নেতৃত্বে পরিচালিত নির্বাচনে ১৫৪টি সংসদীয় আসন কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছাড়াই নির্বাচিত হয়। প্রধান দুই রাজনৈতিক দল অংশগ্রহণ না করার ফলে একতরফা ফলাফল দেখা দেয়, যা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার পঙ্গুতা নিয়ে সমালোচনা বাড়ায়।
কেএম নূরুল হুদা (২০১৮) কমিশনের সময় ‘রাতের ভোট’ের অভিযোগ তীব্রভাবে উঠে আসে। ভোটারদের ব্যালট বাক্সে আগের রাতেই ভোট ঢোকানোর অভিযোগের পাশাপাশি ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) ক্রয় সংক্রান্ত কয়েকশ কোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগও প্রকাশ পায়। এই বিষয়গুলো নির্বাচন কমিশনের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার মূল কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
কাজী হাবিবুল আউয়াল (২০২৪) নেতৃত্বে পরিচালিত নির্বাচনেও কিছু বিতর্কের ইঙ্গিত পাওয়া যায়, যদিও বিস্তারিত তথ্য সীমিত। তবে পূর্বের ধারাবাহিকতা থেকে দেখা যায়, কমিশনের সিদ্ধান্তগুলো প্রায়ই রাজনৈতিক পক্ষপাতের আলোকে মূল্যায়িত হয়।
বিতর্কের মূল কারণগুলোতে নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্তে স্বচ্ছতার অভাব, ভোটার তালিকা ও ভোটিং প্রক্রিয়ার অনিয়ম, এবং রাজনৈতিক দলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক উল্লেখযোগ্য। এসব বিষয়ের ফলে জনগণের নির্বাচনী প্রক্রিয়ার প্রতি আস্থা কমে গিয়েছে।
সমর্থকরা যুক্তি দেন, কমিশনের কার্যক্রম দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সহায়তা করেছে। তারা উল্লেখ করেন, নির্বাচনের সময় সংঘটিত হিংসা কমে এবং শাসন পরিবর্তন মসৃণভাবে সম্পন্ন হয়েছে।
বিরোধীরা তর্ক করেন, কমিশন এখন ruling party‑এর হাতিয়ার হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা গণতন্ত্রের মৌলিক নীতি ক্ষুণ্ণ করছে। তারা দাবি করেন, স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত না হলে নির্বাচন প্রক্রিয়া বৈধতা হারাবে।
আসন্ন নির্বাচনের প্রস্তুতি ও নির্বাচনী সংস্কারের দাবি বাড়ছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক গোষ্ঠী ও সিভিল সোসাইটি নির্বাচন কমিশনের গঠন, সদস্য নির্বাচন প্রক্রিয়া ও তদারকি ব্যবস্থার ওপর সংশোধনী প্রস্তাব দিচ্ছে। এই প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়িত হলে ভবিষ্যতে কমিশনের স্বতন্ত্রতা ও জনবিশ্বাস পুনরুদ্ধার হতে পারে।
সারসংক্ষেপে, নির্বাচন কমিশনের ৫৪ বছর পূর্ণ হওয়া দেশের গণতান্ত্রিক বিকাশের এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। তার ইতিহাসে সফলতা ও ব্যর্থতার মিশ্রণ রয়েছে; ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে কতটা স্বচ্ছতা, নিরপেক্ষতা ও জনসাধারণের আস্থা পুনর্গঠনে সক্ষমতা অর্জনে।



