ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান ১৪ ফেব্রুয়ারি তেহরানের বৃহৎ জনসভায় দেশের ইসলামি বিপ্লব ও ইসলামি প্রজাতন্ত্রের ৪৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে সরকারী নীতির ত্রুটি স্বীকার করে জনগণের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেন। অনুষ্ঠানটি রাজধানীর ঐতিহাসিক পার্কে অনুষ্ঠিত হয় এবং উপস্থিত ভিড়ের মধ্যে তীব্র চিৎকার শোনা যায়।
গত বছর ডিসেম্বর মাসে মুদ্রাস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয়বৃদ্ধি নিয়ে দেশব্যাপী প্রতিবাদ শুরু হয়, যা ইরান সরকারের কঠোর দমন নীতির ফলে রক্তপাতের দিকে গিয়ে পৌঁছায়। এই ঘটনাগুলোতে বহু নাগরিক আহত ও সম্পত্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়, ফলে সামাজিক উত্তেজনা বৃদ্ধি পায়।
প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান জনসভায় স্বীকার করেন যে, সরকারের কিছু পদক্ষেপ ভুল ছিল এবং তা জনগণের আস্থা ক্ষুণ্ন করেছে। তিনি বলেন, “আমরা জনগণের কণ্ঠস্বর শোনার জন্য প্রস্তুত এবং তাদের সেবা করতে চাই।” এছাড়া তিনি কোনো ধরনের সংঘাতের ইচ্ছা না থাকার কথা পুনরায় জোর দেন।
বিক্ষোভের ফলে সৃষ্ট ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য আর্থিক সহায়তা ও ক্ষতিপূরণ প্রদান করার প্রতিশ্রুতি তিনি দেন। পেজেশকিয়ান উল্লেখ করেন, “যারা এই কঠোর দমন থেকে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তাদের কাছে আমি আন্তরিকভাবে ক্ষমা চাইছি এবং তাদের পুনরুদ্ধারের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করব।” তিনি আরও বলেন, সরকার এই কাজের জন্য সম্পূর্ণ দায়িত্ব গ্রহণ করবে।
বহিরাগত শত্রুদের পরিচালিত “বিদ্বেষপূর্ণ অপপ্রচার”কে ইরানের অস্থিরতার মূল কারণ হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন। পেজেশকিয়ান যুক্তি দেন, বিদেশি হুমকি এবং মিথ্যা তথ্যের মাধ্যমে দেশের অভ্যন্তরীণ সমন্বয় নষ্ট করার চেষ্টা করা হচ্ছে।
ইরান সরকারকে ঘিরে সাম্রাজ্যবাদী শক্তির ষড়যন্ত্রের মুখে জাতীয় ঐক্যের আহ্বান জানিয়ে পেজেশকিয়ান বলেন, “আমরা একসঙ্গে দাঁড়িয়ে আছি এবং আমাদের জাতিকে লক্ষ্য করে চলমান সব ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে একতাবদ্ধ হতে হবে।” তিনি ইরানি জনগণের শক্তি ও ঐক্যকে শত্রুর জন্য উদ্বেগের কারণ হিসেবে তুলে ধরেন।
পারমাণবিক কর্মসূচি সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক আলোচনার ক্ষেত্রে ইরান সরকার প্রস্তুত রয়েছে বলে প্রেসিডেন্ট জোর দেন। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির কোনো ইচ্ছা রাখে না এবং সব ধরণের যাচাই প্রক্রিয়ার জন্য স্বেচ্ছায় অংশ নিতে ইচ্ছুক।
তবে তিনি যুক্তি দেন যে, মার্কিন সরকার ও ইউরোপীয় দেশগুলোর “অবিশ্বাসের দেয়াল” পারমাণবিক আলোচনাকে বাধাগ্রস্ত করছে। পেজেশকিয়ান উল্লেখ করেন, এই অবিশ্বাসের কারণে দুই পক্ষের মধ্যে আস্থা গড়ে ওঠা কঠিন হয়ে পড়েছে।
মার্কিন সরকারের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধিকরণ ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি থামাতে সামরিক হুমকি বজায় রেখেছেন। তিনি ইরানের পরমাণু কার্যক্রমের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য আক্রমণাত্মক পদক্ষেপের ইঙ্গিত দিয়েছেন।
ওয়াশিংটন অঞ্চলে অতিরিক্ত একটি বিমানবাহী রণতরী পাঠানোর পরিকল্পনা বিবেচনা করছে, যা আল-জাজিরা সংস্থা জানিয়েছে। এই পদক্ষেপটি ইরানের পারমাণবিক নীতি পরিবর্তনের সম্ভাবনা কমিয়ে দিতে পারে বলে বিশ্লেষকরা সতর্কতা প্রকাশ করেছেন।
প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী অনুষ্ঠানের সময় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের পতাকায় অগ্নিসংযোগ এবং পদদলিত করার দৃশ্য দেখা যায়। জনসভায় ইসরায়েলি ড্রোনের ধ্বংসাবশেষ এবং ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রের অংশও প্রদর্শিত হয়, যা উপস্থিতদের মধ্যে তীব্র উত্তেজনা সৃষ্টি করে।
বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন, প্রেসিডেন্টের ক্ষমা প্রার্থনা ও জাতীয় ঐক্যের আহ্বান দেশের অভ্যন্তরে শাসনব্যবস্থার বৈধতা পুনরুদ্ধারের একটি কৌশল হতে পারে। একই সঙ্গে পারমাণবিক আলোচনার প্রতি ইরানের উন্মুক্ত মনোভাব আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনে সহায়ক হতে পারে। তবে মার্কিন সরকারের সামরিক হুমকি ও বাহ্যিক চাপের ধারাবাহিকতা ইরানের অভ্যন্তরীণ নীতিকে প্রভাবিত করতে পারে, যা ভবিষ্যতে রাজনৈতিক গতিপথকে নির্ধারণ করবে।



