পৃথিবীর কেন্দ্রীয় অংশে হাইড্রোজেনের পরিমাণ সম্ভবত সমুদ্রের দশকের সমান হতে পারে, এই নতুন ফলাফল বিজ্ঞান জগতে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। গবেষণাটি সাইন্স নিউজের প্রতিবেদন অনুসারে, উচ্চচাপের ল্যাব পরীক্ষা এবং সিসমিক ডেটা বিশ্লেষণের সমন্বয়ে করা হয়েছে।
পৃথিবীর কোর মূলত লোহা ও নিকেল দিয়ে গঠিত, তবে এর ঘনত্ব প্রত্যাশিত মানের চেয়ে কম, যা অতিরিক্ত হালকা উপাদানের উপস্থিতি নির্দেশ করে। পূর্বে সেলেনিয়াম, গন্ধক এবং কার্বনকে সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে বিবেচনা করা হয়, তবে হাইড্রোজেনের ভূমিকা এখন নতুনভাবে আলোচিত হচ্ছে।
এই গবেষণায় যুক্তরাষ্ট্রের একটি শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূবিজ্ঞান ও পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে কাজ করা দল উচ্চচাপের পরীক্ষাগার ব্যবহার করে কোরের শর্ত পুনরায় তৈরি করেছে। তারা লোহা-নিকেল মিশ্রণে হাইড্রোজেন গ্যাসকে একাধিক গিগাপাস্কাল চাপ ও হাজার ডিগ্রি তাপমাত্রায় সংযোজিত করে দেখেছে যে হাইড্রোজেন লোহার গঠনভিত্তিক কাঠামোতে সহজে দ্রবীভূত হয়।
একই সঙ্গে সিসমিক তরঙ্গের গতি এবং কোরের ঘনত্বের বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, হাইড্রোজেনের উপস্থিতি মডেল অনুযায়ী কোরের মোট ভরকে উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস করে। এই হ্রাসের পরিমাণকে সমুদ্রের পরিমাণে রূপান্তর করলে, প্রায় ২০ থেকে ৪০টি পৃথিবীর সমুদ্রের সমান হাইড্রোজেনের ভর অনুমান করা যায়।
গণনা অনুযায়ী, হাইড্রোজেনের মোট ভর প্রায় ১.৫×১০²⁴ কিলোগ্রাম, যা বর্তমান সমুদ্রের মোট ভরের প্রায় ১.৫ গুণ। যদিও হাইড্রোজেন গ্যাসের ঘনত্ব কম, তবে কোরের চরম চাপে এটি তরলীয় বা কঠিন অবস্থায় থাকতে পারে, ফলে এই পরিমাণ সম্ভবপর হয়।
হাইড্রোজেনের এই বৃহৎ সঞ্চয় কোরের ঘনত্ব ও সিসমিক গতি ব্যাখ্যায় নতুন দৃষ্টিকোণ প্রদান করে। হালকা উপাদান হিসেবে হাইড্রোজেন কোরের গড় ঘনত্বকে কমিয়ে দেয়, যা পর্যবেক্ষিত সিসমিক ডেটার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। ফলে পূর্বের মডেলগুলোতে হাইড্রোজেনকে উপেক্ষা করা একটি বড় ত্রুটি হতে পারে।
অধিকন্তু, কোরে হাইড্রোজেনের উপস্থিতি পৃথিবীর চৌম্বকীয় ক্ষেত্রের উৎপাদনে প্রভাব ফেলতে পারে। কোরের তরল অংশে হাইড্রোজেনের উপস্থিতি বৈদ্যুতিক পরিবাহিতা বাড়িয়ে দেয়, যা ডাইনামো প্রক্রিয়াকে শক্তিশালী করতে পারে। এই দিকটি ভবিষ্যৎ গবেষণার জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উত্থাপন করে।
গবেষকরা উল্লেখ করেন, হাইড্রোজেনের এই সঞ্চয় পৃথিবীর ভূগর্ভস্থ জলচক্রের অংশ হতে পারে। যদিও হাইড্রোজেন নিজে পানি নয়, তবে উচ্চচাপে এটি অক্সিজেনের সঙ্গে প্রতিক্রিয়া করে হাইড্রোক্সাইড গঠন করতে পারে, যা গভীর ভূগর্ভে তরলীয় অবস্থায় থাকতে পারে। এ ধরনের প্রক্রিয়া পৃথিবীর দীর্ঘমেয়াদী জলসম্পদের বিবরণে নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারে।
পূর্বে হালকা উপাদান হিসেবে সেলেনিয়াম, গন্ধক এবং কার্বনকে প্রধান প্রার্থী হিসেবে ধরা হয়েছিল, তবে হাইড্রোজেনের সম্ভাবনা এখন বৈজ্ঞানিক আলোচনায় শীর্ষে। এই পরিবর্তন কোরের গঠন মডেলকে পুনর্গঠন করতে এবং পৃথিবীর প্রাথমিক গঠনকালীন শর্তগুলো পুনর্বিবেচনা করতে বাধ্য করে।
তবে গবেষণার ফলাফল এখনও মডেল-নির্ভর এবং পরীক্ষামূলক শর্তের সীমাবদ্ধতার মধ্যে রয়েছে। উচ্চচাপের ল্যাব পরিবেশ এবং প্রকৃত কোরের জটিলতা সম্পূর্ণভাবে মিলিয়ে দেখা কঠিন, তাই ভবিষ্যতে আরও সুনির্দিষ্ট সিসমিক পর্যবেক্ষণ এবং গভীর ভূতাত্ত্বিক গবেষণার প্রয়োজন হবে।
এই নতুন আবিষ্কার বিজ্ঞানী ও সাধারণ পাঠকদের জন্য প্রশ্ন উত্থাপন করে: যদি পৃথিবীর কোরে এত পরিমাণ হাইড্রোজেন থাকে, তবে তা আমাদের গ্রহের দীর্ঘমেয়াদী ভূ-ভৌত প্রক্রিয়ায় কী ধরনের প্রভাব ফেলবে? আরও গবেষণা এই অনিশ্চয়তাকে স্পষ্ট করতে সহায়তা করবে।



