ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান ৪৭তম ইসলামি বিপ্লবের বার্ষিকী উপলক্ষে তেহরানের আজাদি স্কয়ারে অনুষ্ঠিত জনসমাবেশে ইরান সরকার পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে কোনো অতিরিক্ত চাপে নতি স্বীকার করবে না বলে দৃঢ় বক্তব্য রাখেন। তিনি উপস্থিত ভিড়ের সামনে ইরানের স্বার্থ রক্ষা ও আন্তর্জাতিক চুক্তি মানার গুরুত্ব তুলে ধরেন। এই বক্তব্যের পেছনে গত বছর জুনে ইসরায়েলের সঙ্গে সংঘর্ষের পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পুনরায় আলোচনার সূচনা রয়েছে।
উৎসবের আয়োজনের সময় নিরাপত্তা ব্যবস্থা পূর্বের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কঠোর করা হয়েছে; তেহরানের নিরাপত্তা বাহিনীর তীব্র তদারকি এবং সশস্ত্র গার্ডের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। ইরান সরকার এই নিরাপত্তা পদক্ষেপকে দেশের স্বায়ত্তশাসন রক্ষার অংশ হিসেবে উল্লেখ করেছে। একই সঙ্গে, ইরানের নেতৃত্বের পক্ষ থেকে জাতীয় ঐক্য ও আত্মবিশ্বাসের বার্তা প্রচার করা হয়েছে।
ইউ.এস.-ইরান আলোচনার পুনরায় সূচনা হয়েছিল যখন ইসরায়েল-ইরান সংঘর্ষের পর আন্তর্জাতিক চাপ বাড়ে এবং পারমাণবিক বিষয়ে পুনর্মূল্যায়নের প্রয়োজন দেখা দেয়। পেজেশকিয়ান উল্লেখ করেন, এই পুনরায় শুরু হওয়া সংলাপের লক্ষ্য পারমাণবিক বিষয়ে পারস্পরিক বোঝাপড়া গড়ে তোলা। তিনি বলেন, ইরান কোনো ধরনের পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির ইচ্ছা রাখে না এবং আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ প্রক্রিয়ায় পূর্ণ সহযোগিতা করতে প্রস্তুত।
ইরানের দৃষ্টিকোণ থেকে আলোচনার মূল বিষয় হল পারমাণবিক কর্মসূচি সীমাবদ্ধ রাখা, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠীর সমর্থন সম্পর্কিত বিষয়গুলো টেবিলে আনার দাবি করা হয়েছে। পেজেশকিয়ান স্পষ্ট করেন, ইরান এই অতিরিক্ত দাবিগুলোকে অযৌক্তিক চাপ হিসেবে দেখছে এবং সেগুলোর প্রতি সম্মতি দিতে অস্বীকার করেছে। তিনি যুক্তি দেন, পারমাণবিক বিষয়ের বাইরে অতিরিক্ত শর্ত আরোপ করলে সংলাপের সাফল্য ক্ষুণ্ন হবে।
গত সপ্তাহে পুনরায় শুরু হওয়া আলোচনায় উভয় পক্ষের মধ্যে উল্লেখযোগ্য মতপার্থক্য দেখা যায়। ইরান সরকার পারমাণবিক বিষয়ের সীমা অতিক্রম না করে আলোচনার ধারাবাহিকতা চায়, আর যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি দল ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি এবং মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন গোষ্ঠীর প্রতি সমর্থনকে আলোচনার অংশ হিসেবে দাবি করে। এই পার্থক্যগুলো ভবিষ্যতে আলোচনার গতি নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান জোর দিয়ে বলেন, ইরান কোনো ধরনের আক্রমণমূলক পদক্ষেপের মুখে পিছু হটবে না, তবে আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সংলাপ চালিয়ে যাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। তিনি উল্লেখ করেন, ইরান সবসময়ই পারস্পরিক স্বার্থের ভিত্তিতে সমঝোতা খোঁজে এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের যৌক্তিক যাচাইকরণ প্রক্রিয়ায় সক্রিয়ভাবে অংশ নিতে ইচ্ছুক। এই অবস্থানকে ইরানের কূটনৈতিক নীতি হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
ইরান সরকার নিরাপত্তা ব্যবস্থা বাড়ানোর পাশাপাশি জনসাধারণের অংশগ্রহণকে উৎসাহিত করেছে; অনুষ্ঠানে ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তেহরানের প্রধান সড়কগুলোতে গাড়ি চলাচল সীমিত করা হয়েছে এবং নিরাপত্তা ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে। এসব ব্যবস্থা ইরানের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক চিত্র রক্ষার জন্য নেওয়া হয়েছে।
আলোচনার পরবর্তী ধাপ হিসেবে উভয় পক্ষের প্রতিনিধিদের মধ্যে ধারাবাহিক বৈঠক নির্ধারিত হয়েছে, যেখানে পারমাণবিক কর্মসূচির নির্দিষ্ট ধাপ এবং যাচাইকরণ প্রক্রিয়া নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হবে। ইরান সরকার দাবি করে, যদি যুক্তরাষ্ট্র অতিরিক্ত শর্ত আরোপ না করে তবে তারা পারস্পরিক সুবিধাজনক চুক্তি স্বাক্ষরের দিকে অগ্রসর হতে পারে। তবে বর্তমান পার্থক্যগুলো সমাধান না হলে আলোচনার অগ্রগতি ধীর হতে পারে।
আঞ্চলিক বিশ্লেষকরা ইঙ্গিত করেন, ইরানের এই দৃঢ় অবস্থান মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা কাঠামোতে প্রভাব ফেলতে পারে এবং অন্যান্য দেশগুলোকে তাদের নিজস্ব কূটনৈতিক কৌশল পুনর্বিবেচনা করতে বাধ্য করতে পারে। ইরান সরকার যদি পারমাণবিক বিষয়ে স্বচ্ছতা বজায় রাখে, তবে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমর্থন অর্জন করতে পারে। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের অতিরিক্ত চাহিদা যদি অগ্রাহ্য করা হয়, তবে ইরান-ইউ.এস. সম্পর্কের পুনর্গঠন কঠিন হতে পারে।
ইরান সরকার আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে যৌক্তিক যাচাইকরণ প্রক্রিয়ায় সহযোগিতা করার ইচ্ছা পুনর্ব্যক্ত করেছে এবং পারমাণবিক কর্মসূচির শান্তিপূর্ণ ব্যবহার নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজনীয় সব ধাপ গ্রহণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। পেজেশকিয়ান উল্লেখ করেন, ইরান পারমাণবিক প্রযুক্তি কেবলমাত্র বিদ্যুৎ উৎপাদন ও বৈজ্ঞানিক গবেষণার জন্য ব্যবহার করবে। এই অবস্থানকে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর নজরে আনা হয়েছে।
সারসংক্ষেপে, তেহরানের আজাদি স্কয়ারে অনুষ্ঠিত অনুষ্ঠানে প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান ইরান সরকারের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে অতিরিক্ত চাপে নতি স্বীকার না করার স্পষ্ট ঘোষণা দেন, একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান আলোচনার জটিলতা ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা তুলে ধরেন। ইরান-ইউ.এস. সংলাপের ফলাফল মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক পারমাণবিক নীতিমালার ওপর দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ফেলবে।



