ভারতের সরকার ২০ ফেব্রুয়ারি থেকে নতুন ডিজিটাল নিয়মাবলী কার্যকর করবে, যা সামাজিক মিডিয়া ও অনলাইন প্ল্যাটফর্মে কন্টেন্ট নিয়ন্ত্রণকে কঠোর করবে। এই নির্দেশনা মেটা (ফেসবুক), ইউটিউব এবং এক্স (সাবেক টুইটার) সহ বড় বড় সেবাগুলোর ওপর প্রযোজ্য হবে। এআই (কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা) দ্বারা সৃষ্ট কন্টেন্টের ক্ষেত্রেও একই নিয়ম প্রয়োগ করা হবে।
সরকার সময়সীমা কমানোর নির্দিষ্ট কারণ প্রকাশ করেনি। বিবিসি ও রয়টার্সের রিপোর্ট অনুসারে, সমালোচকরা এটিকে অনলাইন নজরদারির তীব্রতা বাড়ানোর একটি পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন। এতে দেশের গণতান্ত্রিক কাঠামোর ওপর সেন্সরশিপের ঝুঁকি বাড়তে পারে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে।
গত কয়েক বছরে তথ্যপ্রযুক্তি আইনের অধীনে সরকার জাতীয় নিরাপত্তা ও জনশৃঙ্খলার স্বার্থে অবৈধ বলে চিহ্নিত কন্টেন্ট সরাতে বারবার নির্দেশ দিয়েছে। স্বচ্ছতা প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে সরকারি অনুরোধের পর ২৮ হাজারের বেশি ওয়েব লিংক বা ইউআরএল ব্লক করা হয়েছে। এই সংখ্যা নির্দেশ করে যে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে নিয়ন্ত্রণের প্রবণতা ইতিমধ্যে বাড়ছে।
নতুন নিয়ম অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট প্ল্যাটফর্মগুলোতে অবৈধ কন্টেন্ট প্রকাশিত হলে তা স্পষ্টভাবে লেবেল করতে হবে। লেবেলিংয়ের পাশাপাশি, কন্টেন্টের উৎস চিহ্নিত করতে স্থায়ী চিহ্ন যুক্ত করার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে। একবার লেবেল যুক্ত হলে, কোম্পানিগুলো তা অপসারণের অনুমতি পাবে না।
কন্টেন্ট লেবেল করার সময়সীমা তিন ঘণ্টা নির্ধারিত হয়েছে, যা প্ল্যাটফর্মগুলোকে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে বাধ্য করবে। ডিজিটাল ফিউচারস ল্যাবের গবেষক অনুশকা জৈন উল্লেখ করেন, এই সময়সীমা স্বয়ংক্রিয় সিস্টেমের ব্যবহার বাড়াতে পারে। স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা অতিরিক্ত সেন্সরশিপের ঝুঁকি বাড়াতে পারে, কারণ মানবিক পর্যালোচনা সীমিত হবে।
লেবেলিং প্রক্রিয়া স্বচ্ছতা বাড়াবে বলে জৈন বিশ্বাস করেন, কারণ ব্যবহারকারীরা কন্টেন্টের প্রকৃতি ও উৎস সম্পর্কে স্পষ্ট তথ্য পাবেন। তবে তিনি সতর্ক করেন, স্বয়ংক্রিয় ফিল্টারিংয়ের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা ভুলভাবে বৈধ কন্টেন্টকে সীমাবদ্ধ করতে পারে।
প্রযুক্তি বিশ্লেষক প্রসান্ত কে রায় বলেন, এই নিয়ম সম্ভবত কোনো গণতান্ত্রিক দেশের সবচেয়ে কঠোর কন্টেন্ট অপসারণ ব্যবস্থা হতে পারে। এমন কঠোর নীতি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ভারতের ডিজিটাল নীতি নিয়ে আলোচনার বিষয় হয়ে উঠতে পারে।
এআই-সৃষ্ট কন্টেন্টের ওপরও একই লেবেলিং বাধ্যতামূলক করা হয়েছে, যা ভবিষ্যতে জেনারেটিভ এআই টুলের ব্যবহারকে প্রভাবিত করবে। প্ল্যাটফর্মগুলোকে এআই মডেল থেকে উৎপন্ন ভিডিও, ছবি বা টেক্সটের জন্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে লেবেল তৈরি করতে হবে।
প্রতিষ্ঠানগুলো এখন থেকে লেবেলিং প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করার জন্য প্রযুক্তিগত অবকাঠামো উন্নয়নে বিনিয়োগ বাড়াতে পারে। কিছু বড় প্ল্যাটফর্ম ইতিমধ্যে স্বয়ংক্রিয় কন্টেন্ট শনাক্তকরণ সিস্টেমে আপডেটের পরিকল্পনা জানিয়েছে।
সামাজিক মিডিয়া ব্যবহারকারীদের জন্য এই নিয়মের প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে, বিশেষ করে রাজনৈতিক মতামত প্রকাশের ক্ষেত্রে। কন্টেন্টের লেবেলিং ও দ্রুত অপসারণের প্রক্রিয়া ভুলভাবে বৈধ মতামতকে দমন করতে পারে বলে ভয় প্রকাশ করা হয়েছে।
সরকার দাবি করে, নতুন নির্দেশনা জাতীয় নিরাপত্তা ও জনশৃঙ্খলা রক্ষার জন্য প্রয়োজনীয়। এটি ডিজিটাল পরিবেশে অবৈধ কন্টেন্টের দ্রুত সনাক্তকরণ ও নিষ্কাশন নিশ্চিত করবে বলে তারা বলছে।
নিয়মের বাস্তবায়ন কীভাবে কাজ করবে এবং এর ফলে ডিজিটাল স্বাধীনতা কতটা প্রভাবিত হবে, তা সময়ের পরীক্ষা হবে। দীর্ঘমেয়াদে স্বচ্ছতা ও নিরাপত্তার মধ্যে সঠিক ভারসাম্য বজায় রাখা দেশের প্রযুক্তি নীতির সাফল্যের মূল চাবিকাঠি হবে।



