ডিসেম্বর ১১ তারিখে নির্বাচনী সময়সূচি প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে জাতীয় সংসদীয় নির্বাচনের আচরণবিধি কার্যকর হয়। এই বিধি প্রার্থীদের পাশাপাশি তাদের নির্বাচনী প্রতিনিধি ও সমর্থকদের উপরও প্রযোজ্য, এবং চূড়ান্ত ফলাফলের গেজেট প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত কার্যকর থাকে। তবে বাস্তবে বিভিন্ন দল ও প্রার্থী ফেসবুকে ধর্মীয় রঙের বিজ্ঞাপন ও অপ্রচারিত পোস্ট ব্যবহার করে প্রতিপক্ষকে “খারাপ মুসলিম” হিসেবে চিত্রায়িত করার চেষ্টা করছে।
বিধির ধারা ১৬(ই) স্পষ্টভাবে বলে যে কোনো ব্যক্তি ধর্মীয় বা জাতিগত অনুভূতি ব্যবহার করে নির্বাচনী সুবিধা অর্জন করতে পারবে না। এই বিধান সামাজিক মিডিয়ায় নির্বাচনী আচরণ নিয়ন্ত্রণের মূল ভিত্তি হিসেবে কাজ করে এবং লঙ্ঘন করলে শাস্তি আরোপের সম্ভাবনা থাকে।
সাম্প্রতিক পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, বিএনপি, জামায়াত-এ-ইসলামি এবং অন্যান্য রাজনৈতিক গোষ্ঠী ফেসবুকে পেইড বিজ্ঞাপন ও অপ্রচারিত কন্টেন্ট দিয়ে একে অপরকে ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে অবমূল্যায়ন করছে। এই ধরনের পোস্টগুলো প্রায়শই ধর্মীয় প্রতীক ব্যবহার করে ভোটারকে প্রভাবিত করার লক্ষ্যে তৈরি।
একটি বিশ্লেষণে ৩৩টি ফেসবুক পেজ, গ্রুপ ও প্রোফাইল থেকে মোট ৫৫টি ধর্মীয়ভাবে উস্কানিমূলক পোস্ট সংগ্রহ করা হয়েছে। এদের মধ্যে প্রায় অর্ধেক, অর্থাৎ ৩০টি পোস্ট, বিএনপি ও জামায়াত-এ-ইসলামির সমর্থনে প্রকাশিত হয়েছে।
বিএনপি সমর্থক ও জামায়াত বিরোধী কর্মীরা দাবি করে যে জামায়াত-এ-ইসলামির নেতারা ভোটের বিনিময়ে “জান্নাতে টিকিট” দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। এই অভিযোগগুলো সামাজিক মিডিয়ায় ব্যাপকভাবে শেয়ার করা হচ্ছে এবং ভোটারদের মধ্যে ধর্মীয় সংবেদনশীলতা বাড়িয়ে তুলতে লক্ষ্য করা হচ্ছে।
অন্যদিকে, জামায়াত-এ-ইসলামি ও তার ১১টি জোটের অংশীদাররা তাদের প্রতিপক্ষকে “মৌসুমী মুসলিম” হিসেবে চিহ্নিত করছেন, যারা নির্বাচনের সময়ই দাড়ি ও তুপি পরিধান করে ভোটারকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করে। এই রকম রেটোরিক্স উভয় পক্ষের মধ্যে ধর্মীয় উত্তেজনা বাড়িয়ে তুলছে।
নির্বাচনী কমিশনার আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ একটি প্রেস কনফারেন্সে উল্লেখ করেন যে কমিশন তাত্ত্বিক বিতর্কে জড়াতে চায় না; কোনো স্পষ্ট লঙ্ঘন দেখা দিলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি আরও জানান যে রিটার্নিং অফিসারগণ পরিস্থিতি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবেন এবং শুধুমাত্র একটি ফেসবুক পোস্টের ভিত্তিতে চূড়ান্ত মন্তব্য করা সম্ভব নয়।
বিধি অনুযায়ী, নির্বাচনী আচরণবিধি চূড়ান্ত ফলাফলের গেজেট প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত কার্যকর থাকবে। এই সময়ে কমিশন সামাজিক মিডিয়ায় চলমান বিষয়গুলো ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করছে এবং লঙ্ঘনকারী পক্ষের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপের সম্ভাবনা উন্মুক্ত রেখেছে।
ভবিষ্যতে, ধর্মীয় রঙের প্রচারণা যদি নিয়মিতভাবে চলতে থাকে তবে নির্বাচনী কমিশনের তত্ত্বাবধানে কঠোর শাস্তি আরোপের সম্ভাবনা বাড়বে। একই সঙ্গে, ভোটারদের মধ্যে ধর্মীয় ভিত্তিক ভোটাভুটি বাড়তে পারে, যা রাজনৈতিক গতি-প্রকৃতিকে প্রভাবিত করবে।
সামগ্রিকভাবে, ধর্মীয় সংবেদনশীলতা ব্যবহার করে ভোটারকে প্রভাবিত করার প্রচেষ্টা নির্বাচনী কোডের সরাসরি লঙ্ঘন এবং দেশের রাজনৈতিক পরিবেশে নতুন উত্তেজনা সৃষ্টি করছে। এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কমিশনের পদক্ষেপ এবং সামাজিক মিডিয়ার স্বচ্ছতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।



