মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বুধবার ভেনেজুয়েলার তেল ও গ্যাস খাতে আরেকটি শিথিল পদক্ষেপ গ্রহণ করে, যা আমেরিকান কোম্পানিগুলোর জন্য দেশের তেল সম্পদে অংশগ্রহণের সুযোগ বাড়াবে। এই সিদ্ধান্তটি যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বিভাগ থেকে জারি করা তিনটি লাইসেন্সের মাধ্যমে বাস্তবায়িত হবে এবং ১০ ফেব্রুয়ারি থেকে কার্যকর হবে। শিথিলকরণটি ভেনেজুয়েলার সরকার ও রাষ্ট্রীয় তেল সংস্থা পেট্রোলিওস ডি ভেনেজুয়েলা (PDVSA) এর সঙ্গে নির্দিষ্ট লেনদেনকে অনুমোদন করবে।
মার্কিন ট্রেজারি একটি লাইসেন্স জারি করেছে, যার মাধ্যমে ভেনেজুয়েলার সরকার ও PDVSA তেল বা গ্যাস অনুসন্ধান, উন্নয়ন ও উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় পণ্য, প্রযুক্তি এবং সফটওয়্যার সরবরাহ করতে পারবে। এই অনুমোদনটি তেল ক্ষেত্রের আধুনিকীকরণ এবং উৎপাদন ক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্য নিয়ে নেওয়া হয়েছে।
দ্বিতীয় লাইসেন্সটি বন্দর ও বিমানবন্দর কার্যক্রমের সঙ্গে সম্পর্কিত লেনদেনকে অনুমোদন করে, ফলে ভেনেজুয়েলার রপ্তানি ও আমদানি প্রক্রিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানিগুলো সহজে অংশ নিতে পারবে। তৃতীয় লাইসেন্সটি ভেনেজুয়েলা উৎসের তেলের সঙ্গে যুক্ত কিছু নির্দিষ্ট কার্যক্রমকে বৈধতা প্রদান করে, যা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য চ্যানেল খুলে দেবে।
এই পদক্ষেপের পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদী কূটনৈতিক চাপ রয়েছে। ২০১৯ সালে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নিকোলাস মাদুরোর সরকারকে উৎখাত করার পর থেকে, ভেনেজুয়েলার তেল শিল্পে আমেরিকান বিনিয়োগের দরজা খুলে দেওয়ার দাবি বারবার তীব্র হয়েছে। ট্রাম্পের প্রশাসন মাদুরোর সরকারকে বৈধতা না দিয়ে, তেল সম্পদের ওপর প্রবেশাধিকার সীমিত করার জন্য নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল।
মাদুরোর সরকারকে পরিবর্তন করার লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্র ডেলসি রড্রিগেজকে নতুন প্রেসিডেন্টের শর্তে ক্ষমতায় বসিয়েছিল, যাতে ভেনেজুয়েলার বিশাল তেল মজুদের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ রক্ষা করা যায়। রড্রিগেজের নেতৃত্বে ভেনেজুয়েলা সরকার আন্তর্জাতিক আর্থিক সিস্টেমে পুনরায় প্রবেশের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে, যদিও এখনও সম্পূর্ণভাবে নিষেধাজ্ঞা থেকে মুক্তি পায়নি।
মার্কিন শক্তি সচিব ক্রিস রাইটের ভেনেজুয়েলায় তেল সংক্রান্ত আলোচনার জন্য অজানা তারিখে সফর করার পরিকল্পনা রয়েছে, যা মিডিয়া সূত্রে জানানো হয়েছে। রাইটের সফর তেল শিল্পে নতুন বিনিয়োগের সম্ভাবনা মূল্যায়ন এবং ভেনেজুয়েলার সরকারকে আরও শিথিল নীতিমালা গ্রহণে উৎসাহিত করার উদ্দেশ্য বহন করে।
ভেনেজুয়েলা বিশ্বের প্রমাণিত তেল মজুদের প্রায় এক-পঞ্চম অংশের অধিকারী, যা তার ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্বকে বাড়িয়ে দেয়। ২০১৯ সালের আগে দেশটি যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম বড় কাঁচা তেল সরবরাহকারী ছিল, তবে নিষেধাজ্ঞার ফলে তার রপ্তানি ক্ষমতা ব্যাপকভাবে হ্রাস পেয়েছে। এখন শিথিলকরণটি পুনরায় তেল উৎপাদন বাড়িয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে ভেনেজুয়েলার ভূমিকা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে পারে।
ভেনেজুয়েলার সরকার এই লাইসেন্সগুলোকে স্বাগত জানিয়ে বলেছে, যে তারা দেশের অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার এবং তেল শিল্পের আধুনিকায়নের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ সৃষ্টি করবে। সরকার উল্লেখ করেছে যে নতুন অনুমোদনগুলো বিদেশি প্রযুক্তি ও মূলধনের প্রবাহকে সহজ করবে, যা কর্মসংস্থান ও রাজস্ব বৃদ্ধিতে সহায়তা করবে।
মার্কিন ট্রেজারির দৃষ্টিকোণ থেকে এই শিথিলকরণটি তেল বাজারে সরবরাহ বাড়িয়ে মূল্য স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে এবং যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত স্বার্থ রক্ষায় সহায়ক হবে বলে বিবেচিত। তাছাড়া, এটি ভেনেজুয়েলার সরকারকে রাজনৈতিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলতে প্রণোদনা দেবে।
বিশ্লেষকরা অনুমান করছেন, শিথিলকরণে যুক্তরাষ্ট্রের তেল কোম্পানিগুলো ভেনেজুয়েলার প্রকল্পে অংশগ্রহণের জন্য নতুন চুক্তি স্বাক্ষর করতে পারে, যা পরবর্তী কয়েক বছরে তেল উৎপাদন বাড়িয়ে আন্তর্জাতিক মূল্য কাঠামোতে প্রভাব ফেলবে। তবে ভেনেজুয়েলার অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জগুলো এখনও বিনিয়োগের ঝুঁকি বাড়িয়ে রাখে।
সারসংক্ষেপে, মার্কিন ট্রেজারির নতুন লাইসেন্স জারি ভেনেজুয়েলার তেল শিল্পে নিষেধাজ্ঞা শিথিলের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে বিবেচিত, যা উভয় দেশের কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থকে সমন্বয় করার লক্ষ্যে নেওয়া হয়েছে। ভবিষ্যতে এই পদক্ষেপের ফলাফল তেল উৎপাদন, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং ভেনেজুয়েলার রাজনৈতিক দিকনির্দেশে কীভাবে প্রভাব ফেলবে, তা সময়ের সাথে স্পষ্ট হবে।



