মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে স্বাক্ষরিত পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি কার্যকর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দুই দেশের মধ্যে পণ্যবাণিজ্যের শুল্ক কাঠামোতে ব্যাপক পরিবর্তন আসবে। চুক্তি অনুযায়ী, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাংলাদেশ ব্যাংককে সাড়ে চার হাজারের বেশি পণ্যের কাস্টমস, সম্পূরক ও নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক শূন্য করা হবে, আর বাংলাদেশ ব্যাংককে মার্কিন বাজারে এক হাজার ছয়শো তেইশটি পণ্যের রপ্তানিতে ১৯ শতাংশ পাল্টা শুল্ক আরোপ না করা হবে।
চুক্তি কার্যকর হওয়ার দিন থেকে শুল্কমুক্তি তৎক্ষণাৎ প্রয়োগ হবে, তবে বাকি দুই হাজার দুইশো দশটি পণ্যের শুল্ক ধাপে ধাপে হ্রাস করা হবে। প্রথম ধাপে, চুক্তি স্বাক্ষরের পরই ১,৫৩৮ পণ্যের শুল্ক অর্ধেক কমানো হবে, এবং বাকি অর্ধেক চার বছরের মধ্যে সমান হারে হ্রাস পেয়ে পঞ্চম বছরের জানুয়ারি থেকে সম্পূর্ণ শূন্য হবে। তৃতীয় ধাপে, ৬৭২ পণ্যের শুল্ক প্রথম দিন থেকেই অর্ধেক কমবে, বাকি শুল্ক দশ বছরের মধ্যে ধাপে ধাপে হ্রাস পেয়ে দশম বছরে শূন্যে পৌঁছাবে। চতুর্থ ধাপে, বর্তমানে শূন্য শুল্কে থাকা ৪২২ পণ্যের শুল্ক স্থিত থাকবে, আর অতিরিক্ত ৩২৬ পণ্যের ওপর ট্যারিফ শিডিউল অনুযায়ী শুল্ক আদায় করা যাবে।
শুল্কমুক্তি সত্ত্বেও, আমদানি পর্যায়ে মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট), মূসক, অগ্রিম কর ও অগ্রিম আয়কর ইত্যাদি আরোপিত থাকবে, যা আমদানিকারকদের অতিরিক্ত ব্যয় বহন করতে হবে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে আসা পণ্যের রাজস্বের ৩৮ শতাংশ শুল্ক থেকে, আর ৬২ শতাংশ বিভিন্ন কর থেকে সংগ্রহ করা হয়। তাই শুল্কমুক্তি সরাসরি রাজস্বের হ্রাস ঘটাবে না, তবে করের মাধ্যমে আয় বজায় থাকবে।
রপ্তানি সুবিধার ক্ষেত্রে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশ ব্যাংকের এক হাজার ছয়শো তেইশটি পণ্যের ওপর ১৯ শতাংশ পাল্টা শুল্ক আরোপ না করা হবে। তবে এই পণ্যগুলোর ওপর স্বাভাবিক আমদানি শুল্ক (MFN) বজায় থাকবে, ফলে রপ্তানিকারকদের কিছুটা অতিরিক্ত খরচের সম্ভাবনা রয়ে যাবে। এই সুবিধা বিশেষ করে কৃষি, টেক্সটাইল ও হালকা শিল্পের পণ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ, যেখানে মার্কিন বাজারের চাহিদা উচ্চ।
চুক্তির কপি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধির (ইউএসটিআর) ওয়েবসাইটে প্রকাশের পর, বিশ্লেষকরা শুল্কমুক্তির ফলে দু’দেশের বাণিজ্য পরিমাণে উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি প্রত্যাশা করছেন। বিশেষ করে বাংলাদেশ ব্যাংকের রপ্তানি পণ্যের বৈচিত্র্য বাড়বে, এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সরবরাহকারী পণ্যের দামের প্রতিযোগিতা বাড়বে, যা ভোক্তাদের জন্য উপকারী হবে। তবে শুল্কমুক্ত পণ্যের ওপর করের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার ফলে মোট ব্যয়ের স্তর কিছুটা স্থিতিশীল থাকবে।
দীর্ঘমেয়াদে, শুল্কমুক্তি এবং রপ্তানি সুবিধা উভয়ই বাংলাদেশ ব্যাংকের বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে সহায়তা করবে বলে আশা করা হচ্ছে। তবে শুল্কের ধাপে ধাপে হ্রাসের সময়সূচি এবং করের কাঠামো সঠিকভাবে পরিচালনা না করলে কিছু শিল্পে আয়তন হ্রাসের ঝুঁকি থাকতে পারে। তাই নীতি নির্ধারকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হবে শুল্কমুক্ত পণ্যের বাজারে প্রবেশের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও মানদণ্ড নিশ্চিত করা, পাশাপাশি কর সংগ্রহের কার্যকরী ব্যবস্থা বজায় রাখা।
সারসংক্ষেপে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নতুন বাণিজ্য চুক্তি শুল্কমুক্তি ও রপ্তানি সুবিধার মাধ্যমে দু’দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ককে শক্তিশালী করবে, তবে করের ধারাবাহিকতা এবং ধাপে ধাপে শুল্ক হ্রাসের বাস্তবায়নকে ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন। এই পরিবর্তনগুলো বাংলাদেশের রপ্তানি কাঠামোকে বৈচিত্র্যপূর্ণ করে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান অর্জনে সহায়তা করবে।



