মিয়ানমার শান রাজ্যের স্বায়ত্তশাসিত গোষ্ঠী রেস্টোরেশন কাউন্সিল অব শান স্টেটের (RCSS) প্রধান জেনারেল ইয়াও সের্ক গত সপ্তাহে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে দেশের বেসামরিক জনগণের ওপর বাড়তে থাকা বিমান হামলার দিকে নজর না দেওয়ার জন্য তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি উল্লেখ করেন যে, সামরিক বাহিনীর বেসামরিক এলাকায় চালানো আকাশীয় আক্রমণগুলো ক্রমশ তীব্রতর হচ্ছে এবং বিশ্ব নেতারা এই মানবিক সংকটকে উপেক্ষা করছেন।
সের্কের বক্তব্যের ভিত্তিতে মিয়ানমার পিস মনিটর জানিয়েছে যে, গত ১৫ মাসে সামরিক বাহিনী ১,০০০টিরও বেশি বেসামরিক এলাকায় বিমান হামলা চালিয়েছে। এই সময়ে অন্তত ১,৭২৮ বেসামরিক নাগরিক প্রাণ হারিয়েছেন, যা দেশের মানবিক পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। সের্কের মতে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের অপ্রতুল হস্তক্ষেপের ফলে এই ধ্বংসাত্মক প্রবণতা থামাতে ব্যর্থ হয়েছে।
এই সাক্ষাৎকারটি বহু বছর পর প্রথমবারের মতো মিডিয়ার সঙ্গে অনুষ্ঠিত হয় এবং কেবল রয়টার্সই উপস্থিত ছিল। সের্কের দল লোই তাই লেং নামে থাইল্যান্ডের সীমান্তের কাছে অবস্থিত একটি বনজঙ্গলে ঘেরা পাহাড়ি অঞ্চলে কৌশলগত নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখে, যা চীন ও থাইল্যান্ডের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ পরিবহন ও সরবরাহ পথকে প্রভাবিত করে।
২০২১ সালে নোবেল শান্তি পুরস্কারপ্রাপ্ত অং সান সু চি নেতৃত্বাধীন সরকার সামরিক কূপের পরে ক্ষমতা হারানোর পর থেকে মিয়ানমারে সংঘাত অব্যাহত রয়েছে। সু চি সরকার দেশের প্রথম গণতান্ত্রিক প্রশাসন হিসেবে স্বীকৃত ছিল, তবে তার পতনের পর দেশটি পুনরায় সামরিক শাসনের অধীনে চলে আসে। সের্কের মতে, এই রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং সামরিকের বেসামরিকদের ওপর আকাশীয় আক্রমণ দেশের শান্তি প্রক্রিয়াকে ব্যাপকভাবে ব্যাহত করেছে।
সামরিক বাহিনীর পক্ষ থেকে জাঁতা (Junta) বেসামরিকদের ওপর হামলার অভিযোগ অস্বীকার করে এবং দাবি করে যে তাদের লক্ষ্য শুধুমাত্র সন্ত্রাসী গোষ্ঠী। তবে সের্কের দল এই দাবিকে অস্বীকার করে এবং উল্লেখ করেন যে, সামরিকের আক্রমণগুলো প্রায়শই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্যকেন্দ্র এবং গৃহবসতিগুলিকে লক্ষ্যবস্তু করে। তিনি আরও বলেন, “আজকের দিনে, আমরা আর কার ওপর ভরসা করতে পারি তা পরিষ্কার নয়,” এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে মানবিক সহায়তা ও রাজনৈতিক সংলাপের মাধ্যমে পরিস্থিতি পরিবর্তনের আহ্বান জানান।
আঞ্চলিক বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন যে, চীন বর্তমানে মিয়ানমারের সংঘাতে একমাত্র সরাসরি হস্তক্ষেপকারী দেশ হিসেবে দেখা যাচ্ছে। চীনের কূটনৈতিক নীতি সাধারণত অ-হস্তক্ষেপের উপর ভিত্তি করে, তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাণিজ্যিক স্বার্থ এবং সীমান্ত নিরাপত্তার কারণে চীন কিছু পরিমাণে জড়িত হয়েছে। থাইল্যান্ডও সীমান্তের নিরাপত্তা ও শরণার্থীর প্রবাহ নিয়ন্ত্রণের জন্য জড়িত, তবে সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপের কথা এখনো স্পষ্ট নয়।
সের্কের দল লোই তাই লেং-এ অবস্থিত সদর দপ্তরের মাধ্যমে চীন ও থাইল্যান্ডের মধ্যে কৌশলগত অঞ্চল নিয়ন্ত্রণ করে, যা উভয় দেশের বাণিজ্যিক রুট এবং সীমান্ত নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এই অবস্থানকে কেন্দ্র করে মিয়ানমার সামরিকের সঙ্গে গোষ্ঠীর মধ্যে নিয়মিত সংঘর্ষ দেখা যায়, যা অঞ্চলের স্থিতিশীলতাকে হুমকির মুখে ফেলছে।
শান ন্যাশনাল ডে-র পর সের্কের আরেকটি প্রকাশনা ছিল, যেখানে তিনি মিয়ানমারের বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর মধ্যে পারস্পরিক আস্থা বাড়ানোর জন্য পদক্ষেপের আহ্বান জানান। তিনি জোর দিয়ে বলেন যে, সামরিকের সঙ্গে রাজনৈতিক সংলাপ ছাড়া যুদ্ধের সমাপ্তি সম্ভব নয় এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে এই সংলাপকে সহায়তা করতে হবে।
রয়টার্সের জাঁতা পক্ষের মুখপাত্রের সঙ্গে যোগাযোগের প্রচেষ্টা সত্ত্বেও কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি। এই অপ্রতিক্রিয়া আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের মধ্যে জাঁতার নীতি ও মানবিক দায়িত্ব সম্পর্কে প্রশ্ন উত্থাপন করেছে।
মিয়ানমারের বর্তমান মানবিক সংকটের প্রভাব শুধুমাত্র দেশের অভ্যন্তরে সীমাবদ্ধ নয়; এটি প্রতিবেশী দেশগুলোর নিরাপত্তা, শরণার্থী প্রবাহ এবং আঞ্চলিক বাণিজ্যিক রুটের ওপরও প্রভাব ফেলছে। আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং মানবিক সংস্থাগুলো এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় ত্বরিত পদক্ষেপের আহ্বান জানাচ্ছে, তবে এখন পর্যন্ত কোনো সমন্বিত আন্তর্জাতিক উদ্যোগ গড়ে ওঠেনি।
বিশ্বের প্রধান শক্তিগুলোর মধ্যে, যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন মিয়ানমারের মানবিক সংকটের প্রতি উদ্বেগ প্রকাশ করেছে, তবে সরাসরি হস্তক্ষেপের পরিবর্তে নীতি-নির্ধারণ এবং মানবিক সহায়তার মাধ্যমে সমাধান খোঁজার কথা বলছে। এই পদ্ধতি মিয়ানমারের সামরিক শাসনের সঙ্গে সরাসরি মুখোমুখি হওয়ার ঝুঁকি কমাতে চায়, তবে সের্কের মতে এটি বেসামরিকদের ওপর চলমান আক্রমণ থামাতে যথেষ্ট নয়।
সারসংক্ষেপে, শান গোষ্ঠীর জেনারেল ইয়াও সের্কের দাবি হল, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের অপ্রতুল মনোযোগ এবং সামরিকের বেসামরিক এলাকায় বাড়তে থাকা বিমান হামলা মিয়ানমারের মানবিক সংকটকে আরও তীব্র করে তুলছে। তিনি কূটনৈতিক সংলাপ, আস্থা গঠন এবং মানবিক সহায়তার মাধ্যমে পরিস্থিতি পরিবর্তনের জরুরি প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছেন, যা এখনো আন্তর্জাতিক নীতিনির্ধারকদের সামনে একটি চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে।



