নির্বাচনের শেষ ঘণ্টা ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে সাভার ও আশুলিয়া শিল্পকেন্দ্রের লাখো শ্রমিক ভোট দিতে গ্রামে না গিয়ে বিরক্তিকর পরিস্থিতি তৈরি করেছে। দেশের অর্থনৈতিক হাব হিসেবে পরিচিত এই এলাকায় বসবাসরত কর্মীরা বাসভাড়া ও যাতায়াতের খরচের তীব্র বৃদ্ধির মুখে ভোটের অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। একই সঙ্গে রমজান ও ঈদুল ফিতরের নিকটবর্তী সময়ে সীমিত সঞ্চয় ব্যবহার করতে না পারার উদ্বেগ তাদের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করেছে।
সাভার ও আশুলিয়া আর শুধুমাত্র একটি উপজেলা বা থানা নয়; এখানে প্রায় ৪০ লাখ মানুষ বসবাস করে, যাদের বেশিরভাগই দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আসা পোশাকশ্রমিক। কুড়িগ্রাম থেকে ভোলা পর্যন্ত সব জেলায় থেকে কর্মীরা এখানে কাজের সন্ধান পেয়ে দেশের রপ্তানি শিল্পকে চালিত করে চলেছে। এই বিশাল জনসংখ্যা গঠনের পেছনে প্রায় দুই হাজারের বেশি কারখানা রয়েছে, যেখানে শ্রমিকরা দিনরাত কঠোর পরিশ্রম করে দেশের অর্থনৈতিক প্রবাহ বজায় রাখে।
ভোটের সময়ে যাতায়াতের খরচ স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় তিন থেকে চার গুণ বেড়েছে, যা সাধারণ শ্রমিকের জন্য বড় বোঝা। একক পরিবারে বাড়ি ফিরে ভোট দেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যয় বর্তমান বাজারে অপ্রাপ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। অতিরিক্তভাবে, নির্বাচনের ঠিক কয়েক দিন পরে রমজান মাসের সূচনা এবং ঈদুল ফিতরের নিকটতা কর্মীদের আর্থিক চাপ বাড়িয়ে দেয়।
অনেক শ্রমিকের কাছে রমজান ও ঈদ উভয়ই গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠান, যার জন্য তারা সামান্য সঞ্চয়ই রাখে। এই সময়ে অতিরিক্ত ব্যয় না করে পরিবারের জন্য খাবার, ইফতার ও ঈদের নতুন পোশাকের ব্যবস্থা করা প্রাধান্য পায়। ফলে ভোটের জন্য দীর্ঘ দূরত্ব অতিক্রম করে বাড়ি যাওয়া তাদের জন্য আর্থিকভাবে কঠিন হয়ে দাঁড়ায়।
দীর্ঘ পথের যাতায়াতের কষ্টও ভোট না দেওয়ার আরেকটি প্রধান কারণ। শ্রমিকরা সাধারণত শহরের কেন্দ্র থেকে দূরবর্তী গ্রামাঞ্চলে বাস করে, যেখানে সাশ্রয়ী পরিবহন সুবিধা সীমিত। এই দূরত্ব ও সময়ের ক্ষতি তাদের কাজের সময়সূচি ও জীবিকাকে প্রভাবিত করে, ফলে ভোটের জন্য সময় বের করা কঠিন হয়ে পড়ে।
আশুলিয়ার নিশ্চিন্তপুর এলাকার পোশাকশ্রমিক সায়মা বেগম বলেন, “ভোট দিতে বাড়ি গেলে অন্তত ৫ থেকে ৬ হাজার টাকা খরচ হয়। কয়েকদিন পরই রোজা ও ঈদ, এই টাকা খরচ করলে ঈদে সন্তানদের নতুন জামাকাপড় দিতে পারব না। তাই এবার বাড়ি না গিয়ে ভোট না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।” তার বক্তব্যে আর্থিক সীমাবদ্ধতা ও ধর্মীয় দায়িত্বের দ্বন্দ্ব স্পষ্ট হয়েছে।
অন্যদিকে জামগড়া এলাকার শ্রমিক অনিক একই উদ্বেগ শেয়ার করেন। তিনি উল্লেখ করেন, “নির্বাচনের সময়ে গাড়ি পাওয়া কঠিন, যা পাওয়া যায় তার ভাড়াও কয়েকগুণ বেশি। পরিবার নিয়ে বাড়ি যাওয়া এখন আমাদের মতো গরিবের জন্য সম্ভব নয়।” তার মন্তব্যে পরিবহন সেবার অভাব ও উচ্চ ভাড়া শ্রমিকদের ভোটে অংশগ্রহণে বাধা সৃষ্টি করছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা সতর্ক করছেন, সাভার ও আশুলিয়া শিল্পকর্মীদের ভোট না দেওয়া নির্বাচনী সমীকরণে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনতে পারে। এই এলাকায় ভোটের সংখ্যা বহু আসনের ফলাফলে প্রভাব ফেলতে পারে, বিশেষ করে যেখানে ভোটের পার্থক্য সূক্ষ্ম। তাই উভয় প্রধান দলই এই ভোটার গোষ্ঠীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে পদক্ষেপ নিতে পারে।
বিশ্লেষকরা আরও উল্লেখ করেন, ভোট না দেওয়া শুধু ব্যক্তিগত অধিকার হারানো নয়, বরং শ্রমিকদের ভবিষ্যৎ নীতি নির্ধারণে স্বরহীন করে তুলতে পারে। রমজান ও ঈদ উভয়ের আগে এই বড় গোষ্ঠীর ভোট না পাওয়া হলে শ্রমিকদের স্বার্থ রক্ষায় সরকারের নীতি প্রণয়নে প্রভাব পড়তে পারে।
এই পরিস্থিতিতে সরকার ও নির্বাচন কমিশনকে জরুরি ব্যবস্থা নিতে হবে, যাতে ভোটারদের জন্য সাশ্রয়ী যাতায়াত ব্যবস্থা ও ভোটদান কেন্দ্রের নিকটস্থতা নিশ্চিত করা যায়। বিশেষ করে রমজান ও ঈদের মতো ধর্মীয় ছুটির সময়ে ভোটারদের আর্থিক চাপ কমাতে বিশেষ সহায়তা প্রদান করা প্রয়োজন।
অবশিষ্ট কয়েক ঘণ্টা বাকি থাকায় ভোটারদের সিদ্ধান্তের ওপর শেষ মুহূর্তের প্রচার ও সহায়তা কার্যকর হতে পারে। শ্রমিক গোষ্ঠীর ভোট না দেওয়া যদি বৃহত্তর মাত্রায় ঘটে, তবে তা নির্বাচনের ফলাফলকে সরাসরি প্রভাবিত করতে পারে এবং ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কৌশলে পরিবর্তন আনতে পারে।
সাভার ও আশুলিয়া শিল্পকর্মীদের ভোটদান না করার মূল কারণগুলো—বর্ধিত যাতায়াত খরচ, রমজান‑ঈদ সংক্রান্ত আর্থিক চাপ এবং দীর্ঘ দূরত্ব—একত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক-রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ উপস্থাপন করছে, যা দেশের নির্বাচনী প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করতে সমাধান প্রয়োজন।



