ইউরোপীয় ইউনিয়ন রোহিঙ্গা শরণার্থী ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্য মানবিক সহায়তা বাড়াতে বাংলাদেশে বিশ্বখাদ্যকর্মসূচি (ডব্লিউএফপি) কে ২০ লাখ ইউরো, অর্থাৎ প্রায় ২৯ কোটি টাকা অতিরিক্ত অনুদান দিয়েছে। এই তহবিলটি ১০ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত ডব্লিউএফপি বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী সরাসরি খাদ্য সহায়তা ও পুষ্টি প্রোগ্রাম চালানোর জন্য বরাদ্দ করা হয়েছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাম্প্রতিক অবদান ডব্লিউএফপির ২০২৫ সালের কার্যক্রমে মোট ১ কোটি ৫৩ লাখ ইউরো তহবিলের সমষ্টি গঠন করে, যা পূর্ববর্তী বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি নির্দেশ করে। এই ধারাবাহিকতা ইইউর রোহিঙ্গা সংকটের প্রতি দীর্ঘমেয়াদী প্রতিশ্রুতি প্রকাশ করে।
ইইউ মানবিক সহায়তা বিভাগের প্রধান ডেভিড জাপ্পা উল্লেখ করেন, ২০২৫ সাল বিশ্বব্যাপী মানবিক চ্যালেঞ্জে ভরপুর ছিল, তবুও ইইউ রোহিঙ্গা সম্প্রদায় ও তাদের আশ্রয়দাতা দেশগুলোর প্রতি সমর্থন বজায় রাখছে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, সংহতি ও সমর্থন ইইউর নীতির মূলভিত্তি এবং এই নীতি অনুসারে ডব্লিউএফপির মতো বিশ্বস্ত অংশীদারদের সঙ্গে কাজ চালিয়ে যাবে।
জাপ্পা আরও উল্লেখ করেন, ইইউ মানবিক সহায়তা প্রদান করতে নিরপেক্ষতা ও চাহিদাভিত্তিক পদ্ধতি অনুসরণ করে। এ জন্য ডব্লিউএফপি ই-ভাউচার সিস্টেমের মাধ্যমে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করছে, যা সরাসরি পরিবারগুলোকে পছন্দের খাবার কেনার সুযোগ দেয়।
বর্তমানে প্রায় বারো লক্ষ মানুষ এই ই-ভাউচার সুবিধা পাচ্ছেন, যার মধ্যে ২০২৪ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে প্রায় এক লক্ষ চল্লিশ হাজার নতুন আগত শরণার্থী অন্তর্ভুক্ত। এই সংখ্যা পূর্বের বছরের তুলনায় বৃদ্ধি পেয়েছে, যা তীব্র মানবিক চাহিদার সূচক।
ডব্লিউএফপির বাংলাদেশে কার্যরত কান্ট্রি ডিরেক্টর সিমোন লসন পার্চমেন্ট বলেন, ইইউর সময়োপযোগী অবদান এবং দীর্ঘস্থায়ী অংশীদারিত্বের জন্য তারা কৃতজ্ঞ। তিনি জোর দিয়ে বলেন, এ ধরনের ধারাবাহিক সমর্থনই ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটাতে সক্ষম করে।
তবে রোহিঙ্গা সংকটের নবম বছরে তহবিল ঘাটতি বাড়ছে। ডব্লিউএফপির অনুমান অনুযায়ী ২০২৬ সালে জীবন রক্ষাকারী খাদ্য ও পুষ্টি সহায়তা চালিয়ে যেতে প্রায় ১৪ কোটি ৭০ লাখ মার্কিন ডলার দরকার। এই পরিমাণের তহবিল না পেলে এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহ থেকে প্রোগ্রাম বন্ধ হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
অতএব আন্তর্জাতিক দাতাদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ সংগ্রহের জরুরি প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। ইইউর এই নতুন অনুদান তহবিলের ঘাটতি পূরণে সহায়তা করবে, তবে সম্পূর্ণ প্রয়োজন মেটাতে আরও বহু দেশ ও সংস্থার অবদান প্রয়োজন।
বিশ্বব্যাপী মানবিক তহবিলের মোট পরিমাণে ইইউ অন্যতম বৃহৎ দাতা, তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে গ্লোবাল দান কমে যাওয়ায় তহবিলের চাপ বাড়ছে। অন্যান্য ইউরোপীয় দেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের দানও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ, তবে ইইউর ধারাবাহিকতা রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জন্য স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করে।
একজন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক মন্তব্য করেন, ইইউর এই পদক্ষেপ রোহিঙ্গা সংকটের সমাধানে কূটনৈতিক ও মানবিক স্তরে সমন্বয়কে শক্তিশালী করে এবং দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা পরিবেশে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। তিনি আরও বলেন, তহবিলের ঘাটতি দূর না হলে মানবিক সহায়তা ব্যাহত হলে শরণার্থীদের জীবনযাত্রা ও প্রতিবেশী দেশের স্থিতিশীলতা ঝুঁকির মুখে পড়বে।
বাংলাদেশের জন্য রোহিঙ্গা শরণার্থীদের সহায়তা কেবল মানবিক দায়িত্ব নয়, বরং আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও সামাজিক সমন্বয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ইইউর এই তহবিলের প্রবাহ স্থানীয় সরকারকে শরণার্থী ক্যাম্পে স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও জীবিকার সুযোগ বাড়াতে সহায়তা করবে, ফলে দীর্ঘমেয়াদী সমন্বয় প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত হবে।
আসন্ন মাসগুলোতে আন্তর্জাতিক দাতা সম্মেলন এবং জাতিসংঘের মানবিক তহবিল সমাবেশে এই তহবিলের চূড়ান্ত অনুমোদন প্রত্যাশিত। বিশেষ করে এপ্রিলের শুরুতে তহবিল নিশ্চিত না হলে ডব্লিউএফপির খাদ্য ভাউচার সিস্টেমে বাধা আসতে পারে, যা শরণার্থীদের মৌলিক পুষ্টি সরবরাহে প্রভাব ফেলবে।
সারসংক্ষেপে, ইইউর ২৯ কোটি টাকার অতিরিক্ত অনুদান রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জন্য জরুরি মানবিক সহায়তা বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে, তবে ২০২৬ সালের তহবিল ঘাটতি দূর করতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমন্বিত প্রচেষ্টা অপরিহার্য।



