চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ মঙ্গলবার চট্টগ্রাম বন্দরের বোর্ডরুমে ‘পোর্ট সিঙ্গেল উইন্ডো‑সিপিএ স্কাই’ সিস্টেমের উদ্বোধন করেছে। এই নতুন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে বন্দর ব্যবহারকারীরা একক লগইনেই সব সেবা পেতে পারবেন, যা কাগজমুক্ত ও স্বয়ংক্রিয় প্রক্রিয়ার দিকে প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে ঘোষিত হয়েছে।
উদ্বোধন অনুষ্ঠানে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এস এম মনিরুজ্জামান উপস্থিত ছিলেন। টেলিকম ও আইটি বিষয়ক বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তায়েবও অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করে সিস্টেমের কার্যপ্রণালী ও প্রত্যাশিত সুবিধা তুলে ধরেছেন।
বন্দরের বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, পূর্বে বন্দর পরিচালনায় বিভিন্ন ডিজিটাল টুল ব্যবহার করা হলেও সেগুলোর মধ্যে কোনো সংযোগ ছিল না। সিপিএ স্কাই এখন রিয়েল‑টাইম মনিটরিং, ডিজিটাল রেডার এবং স্বয়ংক্রিয় জাহাজ ট্র্যাকারসহ একাধিক প্রযুক্তি একত্রিত করে জাহাজের অবস্থান ও চলাচল সরাসরি পর্যবেক্ষণ সম্ভব করে। ব্যবহারকারীরা একবার লগইন করে কাস্টমস, লোডিং, ডকিং ও পেমেন্টসহ সব প্রয়োজনীয় সেবা এক প্ল্যাটফর্মে সম্পন্ন করতে পারবেন।
সিস্টেমের অন্যতম বড় বৈশিষ্ট্য হল আমদানি ও রপ্তানিকারকদের জন্য একক অনুমোদন ও কার্গো ক্লিয়ারেন্সের সুবিধা। এখন তারা জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, ব্যাংক ও অন্যান্য সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থার সঙ্গে সরাসরি ডেটা সংযোগের মাধ্যমে কাগজপত্র ছাড়াই সব প্রয়োজনীয় অনুমোদন পেতে পারবেন। এই সংহতকরণ প্রতিটি ধাপে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করে, যা ব্যবসা সহজীকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।
ফয়েজ আহমদ তায়েব উল্লেখ করেছেন যে, সিপিএ স্কাই চালু হওয়ার ফলে বন্দর পরিচালনার গতি তিন থেকে পাঁচ গুণ বাড়বে। তিনি বলেন, দ্রুততর পরিষেবা দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবাহ ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনবে। এই উন্নয়ন বাণিজ্যিক লেনদেনের সময়সীমা কমিয়ে শিপিং খরচ হ্রাস এবং রপ্তানি‑আমদানি কার্যক্রমের দক্ষতা বাড়াবে।
বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করছেন, বন্দর ব্যবস্থাপনার এই ডিজিটাল রূপান্তর চট্টগ্রামকে দক্ষিণ এশিয়ার প্রধান লজিস্টিক হাবের পথে এগিয়ে নিয়ে যাবে। কাগজমুক্ত প্রক্রিয়া ও রিয়েল‑টাইম তথ্যের প্রবেশাধিকার সরবরাহের মাধ্যমে শিপার, ফ্রেট ফরোয়ার্ডার ও কাস্টমস এজেন্টদের মধ্যে সমন্বয় বাড়বে, ফলে ডকিং ও লোডিং সময় কমে যাবে। একই সঙ্গে, স্বয়ংক্রিয় ভ্যাসেল ট্র্যাকার জাহাজের অবস্থান সঠিকভাবে ট্র্যাক করতে সাহায্য করবে, যা নিরাপত্তা ও পরিকল্পনা দুটোই উন্নত করবে।
বন্দরের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় সিপিএ স্কাইকে অন্যান্য বন্দর ও শিপিং লাইনগুলোর সঙ্গে আন্তঃসংযোগের ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করা হবে। একবার ডেটা ইন্টিগ্রেশন সম্পন্ন হলে, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কর সংগ্রহ, ব্যাংকের পেমেন্ট ও অন্যান্য সরকারি সেবার সঙ্গে স্বয়ংক্রিয় সমন্বয় সম্ভব হবে। ফলে বাণিজ্যিক লেনদেনের প্রতিটি স্তরে স্বচ্ছতা বৃদ্ধি পাবে এবং দুর্নীতি বা অনিয়মের ঝুঁকি কমবে।
বাজার বিশ্লেষকরা অনুমান করছেন, সিপিএ স্কাইয়ের কার্যকরী ব্যবহার শুরু হওয়ার পর বন্দর টার্নঅ্যারাউন্ড সময় উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাবে, যা সরবরাহ শৃঙ্খলের দক্ষতা বাড়াবে। এছাড়া, দ্রুত ক্লিয়ারেন্সের ফলে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের চট্টগ্রাম বন্দরকে পছন্দের গন্তব্য হিসেবে বিবেচনা করার সম্ভাবনা বাড়বে। তবে, সিস্টেমের পূর্ণাঙ্গ কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে ব্যবহারকারীদের প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তিগত সহায়তা অব্যাহত রাখা জরুরি।
সারসংক্ষেপে, চট্টগ্রাম বন্দরের ‘সিপিএ স্কাই’ পোর্ট সিঙ্গেল উইন্ডো সিস্টেমের চালু হওয়া বাণিজ্যিক পরিবেশে ডিজিটাল রূপান্তরের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। কাগজমুক্ত, একক লগইন ভিত্তিক সেবা এবং রিয়েল‑টাইম তথ্যের সংহতকরণ বন্দর পরিচালনা দ্রুততর, স্বচ্ছ ও আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে তুলবে। এই পরিবর্তন দেশের বাণিজ্যিক প্রতিযোগিতা বাড়াতে এবং দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে সহায়তা করবে।



