ঢাকায় ১১ ফেব্রুয়ারি ২০১২ রাতের অল্প সময়ের মধ্যে সংবাদ সম্পাদক সাগর সারোয়ার এবং সিনিয়র প্রতিবেদক মেহেরুন রুনি একসাথে নিহত হন। তাদের মৃত্যুর পরপরই শের-এ-বাংলা নগর পুলিশ স্টেশনে ১২ ফেব্রুয়ারি ২০১২ তারিখে ডাবল মর্ডার মামলা দায়ের করা হয়।
সাগর মাসরাঙ্গা টিভির সংবাদ সম্পাদক ছিলেন, আর রুনি এটিএন বাংলা চ্যানেলে সিনিয়র রিপোর্টার হিসেবে কাজ করতেন। দুজনেই রাজধানীর পশ্চিম রাজার একটি ভাড়া ফ্ল্যাটে বাস করছিলেন, যেখানে হঠাৎ করে তাদের গুলি করে হত্যা করা হয়।
মামলার তদন্তে প্রাথমিকভাবে পিবিআই (পাবলিক অ্যান্ড ব্যুরো ইনভেস্টিগেশন) দল অংশ নেয়, তবে পরবর্তী সময়ে কোনো সুস্পষ্ট অগ্রগতি দেখা যায় না। তদন্তকারীরা শেষ ১৪ বছর জুড়ে মোট ১২৫ বার সময় বাড়ানোর আবেদন করে, কিন্তু প্রতিবারই রিপোর্ট জমা দিতে ব্যর্থ হয়।
মৃত্যুর পরপরই পরিবারগুলোকে দীর্ঘমেয়াদী কষ্টের মুখোমুখি হতে হয়। সাগরের মা, ৭৪ বছর বয়সী সেলাহা মনি, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-নেতৃত্বাধীন গণআন্দোলনের পর শেখ হাসিনা সরকারের পতনের সঙ্গে সঙ্গে ডক্টর মোহাম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের ওপর ন্যায়বিচারের আশায় নতুন করে বিশ্বাস জাগিয়ে তোলেন।
অন্তর্বর্তী সরকারের শাসনকালে মামলায় কোনো অগ্রগতি না হওয়ায় সেলাহা মনি গভীর হতাশায় ডুবে যান। তিনি জানান, “আমি interim সরকারে বড় আশা করেছিলাম, কিন্তু কিছুই হয়নি। এখন মনে হয় আল্লাহ ছাড়া আর কেউ কিছু করতে পারে না।” তার কথায় দীর্ঘ সময়ের অপেক্ষা ও মানসিক চাপের চিহ্ন স্পষ্ট।
সেলাহা বর্তমানে বহু স্বাস্থ্য সমস্যার সঙ্গে সংগ্রাম করছেন; শারীরিক দুর্বলতা এবং মানসিক চাপের ফলে তার স্বাস্থ্যের অবস্থা ক্রমশ খারাপ হচ্ছে। তিনি যোগ্য চিকিৎসা সেবা পাওয়া সত্ত্বেও মামলার অগ্রগতির অনুপস্থিতি তাকে মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।
প্রাথমিক তদন্তে পিবিআই কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন, তবে তাদের কথাবার্তা থেকে মামলাটি ইতিবাচকভাবে এগোবে না এমন ধারণা পাওয়া যায়। এরপর থেকে কোনো ফলো-আপ, কোনো নতুন তথ্য বা সংবাদ প্রকাশিত হয়নি।
রুনির ভাই, নওশের আলম রোমান, যিনি মামলাটি দায়ের করেছিলেন, বলেন, “আমরা অনেক আগে থেকেই আশা ছেড়ে দিয়েছি, তবে ৫ আগস্টের পরে এই সরকারে একটু আশা জাগে। কমপক্ষে সত্যি কী ঘটেছে তা জানার আশা ছিল, কিন্তু কিছুই হয়নি, ন্যূনতম কাজও না করে।” তার বক্তব্যে পরিবারের হতাশা ও অবসাদ স্পষ্ট।
আইনি দিক থেকে দেখা যায়, মামলাটির কোনো প্রমাণভিত্তিক অগ্রগতি না হওয়ায় সন্দেহভাজন বা অপরাধীর ওপর কোনো আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আরোপ করা হয়নি। তদন্তের পুনরায় শুরু বা নতুন দিকনির্দেশনা না পাওয়ায় আদালতও এখনও কোনো রায় প্রদান করেনি।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কালে ডক্টর মোহাম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বে ন্যায়বিচার ব্যবস্থা পুনর্গঠন করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও, এই বিশেষ মামলায় তা বাস্তবায়িত হয়নি। পরিবারগুলো এখনও ন্যায়বিচারের আশায় অপেক্ষা করছে, তবে বাস্তবিক দৃষ্টিতে তা দূরের স্বপ্নের মতোই মনে হচ্ছে।
মামলার বর্তমান অবস্থা অনুসারে, কোনো নতুন তদন্ত দল গঠন বা অতিরিক্ত প্রমাণ সংগ্রহের উদ্যোগ দেখা যায়নি। ফলে সেলাহা মনি ও রুনির পরিবারকে দীর্ঘ সময়ের অস্থিরতা ও মানসিক কষ্টের মধ্যেই বসে থাকতে হচ্ছে, এবং ন্যায়বিচার অর্জনের পথ এখনো অনিশ্চিত।



