২৬ জানুয়ারি, সিঙ্গাপুরের উপকূলে অবস্থানরত একটি ট্যাঙ্কারের ক্রু সদস্য মুম্বাইয়ের আন্তর্জাতিক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশন (ITF) অফিসে জরুরি ইমেইল পাঠায়। ইমেইলে পাঁচজন সহকর্মীর নাম উল্লেখ করে তারা বেতন না পাওয়া, প্রাণীর মতো আচরণ করা এবং খাবারের ঘাটতি নিয়ে অভিযোগ করে। একই সঙ্গে ইমেইলটি বিভিন্ন দেশের নিষেধাজ্ঞা প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোকেও কপি করা হয়।
ITF বিশ্বব্যাপী সমুদ্র কর্মীদের প্রতিনিধিত্বকারী প্রধান সংস্থা, তাই এমন অভিযোগের সঙ্গে তারা পরিচিত। তবে এই বার্তায় বিশেষ দৃষ্টিগোচর হয় যে জাহাজটি নিষেধাজ্ঞা তালিকায় রয়েছে এবং কালো তালিকায় যুক্ত। ক্রু সদস্য জানায় যে “Beeta” নামে পরিচিত জাহাজটি আসলে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা প্রাপ্ত “Gale” নামের ট্যাঙ্কার।
ক্রু সদস্যের মতে, তিনি বহু বছর সমুদ্রে কাজ করেছেন এবং সঠিক ও ভুলের পার্থক্য জানেন। তিনি এবং তার সহকর্মীরা দ্রুত জাহাজ ত্যাগের ইচ্ছা প্রকাশ করে। এই ঘটনা আন্তর্জাতিক সমুদ্র নিরাপত্তা ও নিষেধাজ্ঞা প্রয়োগের ক্ষেত্রে একটি বড় চ্যালেঞ্জের উদাহরণ হয়ে দাঁড়ায়।
বছরের পর বছর ধরে রাশিয়া ও ইরানের তেল পরিবহনকারী ট্যাঙ্কারগুলো আন্তর্জাতিক নৌবিধি এড়িয়ে চলতে বিভিন্ন কৌশল ব্যবহার করে। এই গোপনীয় জাহাজগুলোকে “শ্যাডো ফ্লিট” বলা হয়। সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, ট্যাঙ্কারট্র্যাকারস.কমের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী শ্যাডো ফ্লিটের মোট সংখ্যা বর্তমানে ১,৪৬৮টি, যা রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণের চার বছর আগে তুলনায় প্রায় তিনগুণ।
এই সংখ্যা আন্তর্জাতিকভাবে চলমান ট্যাঙ্কার ফ্লিটের প্রায় ১৮-১৯% গঠন করে এবং সমুদ্রের মাধ্যমে পরিবাহিত কাঁচা তেলের প্রায় ১৭% এই শ্যাডো ফ্লিটের দায়িত্বে। উইন্ডওয়ার্ড এআই-র সিনিয়র মেরিটাইম ইন্টেলিজেন্স বিশ্লেষক মিশেল উইস বকম্যান উল্লেখ করেন, শ্যাডো ফ্লিটের দ্রুত বৃদ্ধি নিষেধাজ্ঞা প্রয়োগকারী দেশগুলোর জন্য একটি গুরুতর ঝুঁকি তৈরি করেছে।
এই প্রবণতা ২০১০-এর দশকে উত্তর কোরিয়া ও ইরান আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা এড়াতে গোপনীয় জাহাজ ব্যবহার শুরু করার সঙ্গে উদ্ভব হয়। এরপর থেকে রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাতের পরিপ্রেক্ষিতে রাশিয়ার তেল রপ্তানি বাড়ার সঙ্গে শ্যাডো ফ্লিটের বিস্তার ত্বরান্বিত হয়েছে। এই জাহাজগুলো প্রায়শই রেজিস্ট্রেশন, পতাকা, মালিকানা তথ্য পরিবর্তন করে নিজেদের পরিচয় গোপন করে, ফলে নিষেধাজ্ঞা পর্যবেক্ষণ ও প্রয়োগ কঠিন হয়ে পড়ে।
মুম্বাইয়ের ITF অফিসে প্রাপ্ত ইমেইলটি দেখায় যে শ্যাডো ফ্লিটের কার্যক্রম শুধুমাত্র একাধিক দেশের নিয়ন্ত্রক সংস্থার নজরে নয়, বরং শ্রমিকদের অধিকার ও নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও প্রভাব ফেলছে। ক্রুদের বেতন না দেওয়া, খাবারের ঘাটতি এবং মানবিক অবহেলা আন্তর্জাতিক শ্রম আইনের লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচিত হয়।
বিশ্বব্যাপী সমুদ্র পরিবহন শিল্পে শ্যাডো ফ্লিটের বৃদ্ধির ফলে নিষেধাজ্ঞা প্রয়োগের কার্যকারিতা হ্রাস পেতে পারে। বিশেষজ্ঞরা জোর দিয়ে বলেন, আন্তর্জাতিক সমুদ্র পর্যবেক্ষণ নেটওয়ার্ককে শক্তিশালী করতে হবে এবং জাহাজের মালিকানা ও রেজিস্ট্রেশন তথ্যের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। এছাড়া, ক্রুদের মৌলিক অধিকার রক্ষার জন্য শ্রমিক সংগঠনগুলোর সক্রিয় ভূমিকা অপরিহার্য।
শ্যাডো ফ্লিটের বর্তমান আকার ও তার দ্বারা পরিবাহিত তেলের পরিমাণ বিবেচনা করে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্য এটি একটি কৌশলগত উদ্বেগের বিষয়। রাশিয়া ও ইরানের তেল রপ্তানি অব্যাহত থাকায়, নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘনকারী জাহাজগুলোকে সনাক্ত ও আটক করার জন্য সমন্বিত নৌবৈজ্ঞানিক ও আইনি পদক্ষেপের প্রয়োজনীয়তা বাড়ছে। ভবিষ্যতে এই ধরনের গোপনীয় জাহাজের সংখ্যা কমাতে, আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইন ও নিষেধাজ্ঞা প্রয়োগের কাঠামোকে আরও কঠোর করা জরুরি।
শ্যাডো ফ্লিটের বিস্তার এবং ক্রুদের মানবিক সমস্যার সমাধান দুটোই সমান্তরালভাবে মোকাবিলা করা দরকার। এ জন্য আন্তর্জাতিক সংস্থা, জাতীয় সরকার এবং শ্রমিক সংগঠনগুলোর সমন্বিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন, যাতে সমুদ্রের নিরাপত্তা, শ্রমিকের অধিকার এবং বৈশ্বিক তেল বাজারের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা যায়।



