শেখ হাসিনার বহু বছর ধরে চালু থাকা শাসন ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের গণবিক্ষোভের পর শেষ হয়েছে, যা দেশের রাজনৈতিক দৃশ্যপটকে নাটকীয়ভাবে পরিবর্তন করেছে। এই ঘটনার ফলে দেশের অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা গণতান্ত্রিক পরিবর্তনের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা শুরু করেন। আগামী বৃহস্পতিবার নির্ধারিত জাতীয় নির্বাচন, এই পরিবর্তনের প্রথম বাস্তব পরীক্ষা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
গণবিক্ষোভের মূল দাবি ছিল স্বৈরাচারী শাসনের অবসান এবং স্বচ্ছ নির্বাচনী প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা। প্রতিবাদকারীরা ঢাকার বিভিন্ন স্থানে সমবেত হয়ে শান্তিপূর্ণভাবে দাবি তুলে ধরেন, তবে কিছু ক্ষেত্রে সশস্ত্র সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়। শেষ পর্যন্ত সরকার শীর্ষ পর্যায়ে পরিবর্তনের সংকেত দেয় এবং শেখ হাসিনার পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নেয়।
নির্বাচনের পূর্বে রাজনৈতিক পরিবেশটি অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তায় ভরপুর। কর্মসংস্থান, শিল্প ও সরকারি সেক্টরে ধারাবাহিক ধর্মঘট ও প্রতিবাদ চলেছে, যা অর্থনৈতিক কার্যক্রমকে ব্যাহত করছে। এই পরিস্থিতি দেশের উন্নয়ন সূচকে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে এবং আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের মনোভাবকে প্রভাবিত করছে।
বিপক্ষের দৃষ্টিকোণ থেকে, খালেদা জিয়া এবং তার নেতৃত্বাধীন বিএনপি এই পরিবর্তনকে স্বৈরাচারী শাসনের অবসানের সুযোগ হিসেবে দেখছে, তবে একই সঙ্গে তারা নির্বাচনী প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করার দাবি তুলে ধরছে। তারা উল্লেখ করেন যে, পূর্বে ২০১১ সালে caretaker সরকার ব্যবস্থা বাতিলের পর থেকে নির্বাচনী অনিয়ম বাড়ে, যা এখনো সম্পূর্ণরূপে সমাধান হয়নি।
গণতন্ত্রের ভিত্তি গড়ে তোলার জন্য প্রয়োজনীয় প্রতিষ্ঠানগুলো যদি অভ্যন্তরীণভাবে দুর্বল হয়ে যায়, তবে পুনর্জাগরণ কঠিন হয়ে পড়ে। বর্তমান পরিস্থিতি এই সত্যকে স্পষ্ট করে দেখাচ্ছে যে, স্বচ্ছ ও স্বতন্ত্র নির্বাচন কমিশন, স্বাধীন বিচারব্যবস্থা এবং কার্যকর মিডিয়া ছাড়া গণতান্ত্রিক পুনর্গঠন অসম্ভব।
১৯৯০-এর দশকের শুরুর দিকে বাংলাদেশের রাজনীতি প্রধানত শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ এবং খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন বিএনপির মধ্যে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার ওপর নির্ভরশীল ছিল। যদিও উভয় দলের নীতি ও আদর্শে পার্থক্য সীমিত, তবু নির্বাচনী লড়াইয়ে তারা দীর্ঘ সময় ধরে তিক্ত প্রতিযোগিতা চালিয়ে এসেছে। ঐতিহাসিকভাবে, ক্ষমতার হস্তান্তর তুলনামূলকভাবে শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হতো, যা caretaker সরকার ব্যবস্থা দ্বারা সমর্থিত ছিল।
শেখ হাসিনার শাসনকালে ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ২০১১ সালে caretaker ব্যবস্থা বাতিল করা হয়, ফলে নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় অনিয়মের সুযোগ বৃদ্ধি পায়। এই পরিবর্তনের ফলে স্বজনপ্রীতি, লুটপাট এবং রাজনৈতিক দুর্নীতির মাত্রা বাড়ে, যা দেশের গণতান্ত্রিক কাঠামোকে ক্ষয় করে।
অবশেষে, আগামী নির্বাচনের ফলাফল দেশের রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা নির্ধারণ করবে। যদি স্বচ্ছ ও ন্যায়সঙ্গত নির্বাচন হয়, তবে তা গণতন্ত্রের পুনর্নবীকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। অন্যদিকে, যদি নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় পুনরায় অনিয়ম দেখা দেয়, তবে রাজনৈতিক অস্থিরতা বাড়বে এবং দেশের আন্তর্জাতিক সুনাম ক্ষতিগ্রস্ত হবে। বর্তমান সময়ে দেশের নেতৃত্বের জন্য প্রয়োজনীয় হল প্রতিষ্ঠানগুলোকে স্বতন্ত্র করা এবং নাগরিক সমাজের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা, যাতে গণতন্ত্রের ভিত্তি মজবুত হয়।



