দৈনন্দিন জীবনে অস্বস্তি ও তীব্র ব্যথা বহু মানুষের সম্মুখীন হওয়া একটি বাস্তবতা। সাম্প্রতিক প্রকাশিত ‘Tell Me Where It Hurts’ শিরোনামের বইটি ব্যথার শারীরবিজ্ঞান, রোগের ধরণ এবং আধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতি সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা দেয়। লেখক নিউরোসায়েন্স ও ক্লিনিক্যাল গবেষণার সর্বশেষ ফলাফলকে সহজ ভাষায় উপস্থাপন করেছেন, যা রোগী ও চিকিৎসকদের জন্য ব্যবহারিক নির্দেশিকা হিসেবে কাজ করবে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী প্রাপ্তবয়স্কদের প্রায় ২০% মানুষ দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা ভোগ করেন, যার মধ্যে ১০% রোগীকে তীব্র ব্যথা হিসেবে শ্রেণীবদ্ধ করা হয়। যুক্তরাষ্ট্রে করা এক সমীক্ষা দেখায় যে দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা রোগীদের প্রায় ৩০% ওষুধের ওপর নির্ভরশীল, বিশেষ করে অপিওইডের ব্যবহার বাড়ছে। এই পরিসংখ্যানের প্রেক্ষিতে ব্যথা ব্যবস্থাপনার নতুন পদ্ধতি প্রয়োজনীয়তা বাড়িয়ে দিয়েছে।
বইটি ব্যথার তন্ত্রিক প্রক্রিয়াকে তিনটি স্তরে ভাগ করে ব্যাখ্যা করে: সংবেদনশীল (সেন্সরি), আবেগগত (এফেক্টিভ) এবং জ্ঞানীয় (কগনিটিভ) উপাদান। নিউরোইমেজিং গবেষণায় দেখা গেছে যে ব্যথা সংকেত মস্তিষ্কের সোমাটোসেন্সরি কর্টেক্স, ইনসুলা এবং অ্যান্টেরিয়র সিঙ্গুলেট কর্টেক্সে প্রক্রিয়াজাত হয়। এই অঞ্চলগুলো একসাথে কাজ করে ব্যথার তীব্রতা, স্থান এবং মানসিক প্রভাব নির্ধারণ করে।
প্রচলিতভাবে ব্যথা নিয়ন্ত্রণে প্রধানত ওষুধের ওপর নির্ভর করা হতো, তবে সাম্প্রতিক ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালগুলো শারীরিক থেরাপি, কগনিটিভ বিহেভিয়ার থেরাপি (CBT) এবং মাইন্ডফুলনেস ভিত্তিক হস্তক্ষেপের কার্যকারিতা প্রমাণ করেছে। উদাহরণস্বরূপ, যুক্তরাজ্যের একটি গবেষণায় দেখা যায় যে নিয়মিত ব্যায়াম ও CBT সমন্বিত থেরাপি গ্রহণকারী রোগীদের ব্যথা স্কোর গড়ে ২৫% কমে।
‘Tell Me Where It Hurts’ বইতে এই বহুমুখী পদ্ধতির সংমিশ্রণকে ‘মাল্টিমোডাল পেইন ম্যানেজমেন্ট’ বলা হয়েছে। এতে রোগীর নিজস্ব ব্যথা মানচিত্র তৈরি করার জন্য একটি স্ব-পর্যবেক্ষণ টুল অন্তর্ভুক্ত রয়েছে, যা রোগীকে ব্যথার তীব্রতা, সময় ও প্রভাবের তথ্য রেকর্ড করতে সাহায্য করে। এই ডেটা চিকিৎসকের সঙ্গে শেয়ার করলে ব্যক্তিগতকৃত থেরাপি পরিকল্পনা সহজ হয়।
বইটি উল্লেখ করে যে ব্যথা চিকিৎসায় অপিওইডের অতিরিক্ত ব্যবহার রোধে অ-ওপিওইড বিকল্পের গুরুত্ব বাড়ছে। নন-স্টেরয়েডাল অ্যান্টি-ইনফ্ল্যামেটরি ড্রাগ (NSAIDs), টপিকাল ক্যাপসাইসিন এবং নির্দিষ্ট অ্যান্টিডিপ্রেসেন্টের ব্যবহার নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে কার্যকর প্রমাণিত হয়েছে। তবে এসব ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সম্পর্কে সতর্কতা অবলম্বন করা জরুরি, বিশেষ করে বয়স্ক রোগী ও কিডনি সমস্যাযুক্তদের ক্ষেত্রে।
নতুন গবেষণায় দেখা গেছে যে ব্যথা সংবেদনশীলতা জেনেটিক ফ্যাক্টর ও পরিবেশগত স্ট্রেসের সমন্বয়ে গঠিত। একটি বৃহৎ স্কেল জিনোম-ওয়াইড অ্যাসোসিয়েশন স্টাডি (GWAS) অনুযায়ী, ব্যথা সংবেদনশীলতার সঙ্গে যুক্ত জিনের বৈচিত্র্য প্রায় ১৫% বৈচিত্র্য ব্যাখ্যা করে। এই ফলাফল ভবিষ্যতে ব্যক্তিগতকৃত জেনেটিক থেরাপির সম্ভাবনা উন্মোচন করে।
বইটি রোগীর সক্রিয় অংশগ্রহণের গুরুত্বেও জোর দেয়। স্ব-পর্যবেক্ষণ, ব্যথা ডায়েরি রেকর্ড এবং নিয়মিত শারীরিক কার্যক্রমের মাধ্যমে রোগী নিজের অবস্থার পরিবর্তন ট্র্যাক করতে পারেন। গবেষণায় দেখা যায় যে স্ব-পর্যবেক্ষণ করা রোগীরা চিকিৎসা পরিকল্পনা মেনে চলার হার ২০% বেশি।
বইয়ের একটি অধ্যায়ে ব্যথা ব্যবস্থাপনার জন্য ‘স্টেপ-আপ’ পদ্ধতি উপস্থাপন করা হয়েছে। প্রথম ধাপে সহজ ব্যায়াম ও তাপ-শীতল থেরাপি, দ্বিতীয় ধাপে ফার্মাকোলজিক্যাল হস্তক্ষেপ এবং তৃতীয় ধাপে ইনভেসিভ পদ্ধতি যেমন স্পাইনাল স্টিমুলেশন বা সার্জারি অন্তর্ভুক্ত। এই ধাপক্রমিক পদ্ধতি রোগীর অবস্থা অনুযায়ী চিকিৎসা নির্বাচনকে সহজ করে।
বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করেন যে ব্যথা রোগের মানসিক দিক উপেক্ষা করা হলে চিকিৎসা ফলাফল কমে যায়। দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা রোগীর ডিপ্রেশন ও উদ্বেগের ঝুঁকি বাড়ায়, যা ব্যথার তীব্রতা বাড়িয়ে দেয়। তাই মনোবিদ্যা ও শারীরিক থেরাপির সমন্বয় রোগীর সামগ্রিক সুস্থতা নিশ্চিত করে।
‘Tell Me Where It Hurts’ বইটি রোগী, পরিবার এবং স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীদের জন্য একটি ব্যবহারিক গাইড হিসেবে কাজ করবে বলে আশা করা হচ্ছে। এতে ব্যথা সম্পর্কে ভুল ধারণা দূর করে বৈজ্ঞানিক ভিত্তিক তথ্য প্রদান করা হয়েছে, যা অপ্রয়োজনীয় ওষুধের ব্যবহার কমাতে সহায়ক।
শেষে, ব্যথা নিয়ন্ত্রণে ব্যক্তিগতকৃত পদ্ধতি, বহুমুখী থেরাপি এবং রোগীর সক্রিয় অংশগ্রহণকে মূলমন্ত্র হিসেবে গ্রহণ করা উচিত। আপনি যদি দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা নিয়ে সংগ্রাম করেন, তবে স্ব-পর্যবেক্ষণ টুল ব্যবহার করে আপনার ব্যথার ধরণ নথিভুক্ত করুন এবং আপনার চিকিৎসকের সঙ্গে আলোচনা করুন। আপনার অভিজ্ঞতা শেয়ার করা কি আপনার ব্যথা ব্যবস্থাপনা উন্নত করতে পারে?



