কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শিবিরে বসবাসরত লক্ষাধিক শরণার্থী এখনও প্রত্যাবাসনের কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখেনি, যদিও গত বছর অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের সঙ্গে শিবিরে ইফতার করে রোহিঙ্গাদেরকে “সামনের ঈদ মিয়ানমারে” উদযাপন করার আশ্বাস দিয়েছিলেন। এই প্রতিশ্রুতি ২০২৩ সালের জুলাই মাসে দেওয়া হয় এবং তা থেকে এখনো কোনো বাস্তব পদক্ষেপ দেখা যায়নি। ফলে রোহিঙ্গা পরিবারগুলো কক্সবাজারের পাহাড়ি শিবিরে ঈদ কাটতে বাধ্য, যেখানে সীমিত রেশনের খাবার এবং কোনো উৎসবের আয়োজন নেই।
মুহাম্মদ ইউনূসের এই প্রতিশ্রুতি তার আন্তর্জাতিক মর্যাদা, নোবেল শান্তি পুরস্কার এবং কূটনৈতিক সক্রিয়তা দ্বারা সমর্থিত ছিল। তিনি ২০২৩ সালের জুলাই মাসে জাতিসংঘের শীর্ষ কর্মকর্তার সঙ্গে শিবিরে উপস্থিত হয়ে রোহিঙ্গাদেরকে সরাসরি ইফতার করাতে গিয়ে বলেছিলেন, “সামনের ঈদ রোহিঙ্গারা নিজ ভূমি মিয়ানমারে গিয়ে করবেন।” এই বক্তব্যের পর থেকে রোহিঙ্গা শিবিরে প্রত্যাবাসনের জন্য কোনো আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শুরু হয়নি।
২০২৪ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদ শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নতুন সরকার গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। তবে নির্বাচনের পরেও রোহিঙ্গাদের জন্য নির্ধারিত প্রত্যাবাসন পরিকল্পনা কোনো অগ্রগতি দেখায়নি, এবং ঈদ ছুটির দিনেও শিবিরে বসবাসরত মানুষগুলো একই অবস্থায় রয়ে গেছে।
২০১৭ সালে রাহাইন রাজ্য থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গা শরণার্থীর সংখ্যা তখন প্রায় দশ লক্ষ ছিল, তবে এখন জাতিসংঘ শরণার্থী সংস্থা (UNHCR) অনুসারে এই সংখ্যা প্রায় এক দশলক্ষের কাছাকাছি, আর কিছু বেসরকারি সংস্থা প্রায় পনের লক্ষের কাছাকাছি অনুমান করে। যদিও শিবিরের আয়তন সম্প্রসারণের মাধ্যমে সাময়িকভাবে বাসস্থানের ব্যবস্থা করা হয়েছে, তবে নিরাপদ এবং স্বেচ্ছাসেবী প্রত্যাবাসনের জন্য প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণে মিয়ানমারের সরকারী পক্ষ থেকে কোনো স্পষ্ট অঙ্গীকার দেখা যায় না।
উখিয়ার কুতুপালং শিবিরে বসবাসরত ৪৫ বছর বয়সী আবদুস সালাম বলেন, “আমরা সত্যিই প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। মনে হয়েছিল এবার হয়তো সত্যি ফিরব। এখন বুঝি, কথাটা শুধু কথাই ছিল।” তার কথায় রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের দীর্ঘমেয়াদী প্রত্যাশা এবং বর্তমান বাস্তবতার মধ্যে গভীর ফাঁক স্পষ্ট হয়।
শিবিরে ঈদ মানে উৎসব নয়; বরং আরেকটি বছর হারিয়ে যাওয়ার বেদনা। শিবিরের বাঁশ ও ত্রিপল ঘরে সীমিত রেশনের খাবার রান্না হয়, কোনো সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান বা পারিবারিক মিলনমেলা হয় না। শিবিরের অভ্যন্তরে ঈদ-সন্ধ্যায় শিশুরা ছোটখাটো খেলায় সময় কাটালেও, বড়দের মুখে দীর্ঘস্থায়ী উদ্বেগের ছাপ স্পষ্ট।
এক রোহিঙ্গা কিশোরীর কথায় দেখা যায়, “আমি বাংলাদেশেই বড় হয়েছি, কিন্তু বাংলাদেশ আমার দেশ না, মিয়ানমারও আর চেনে না।” এই বিবৃতি শরণার্থীদের দ্বৈত পরিচয় সংকটকে প্রকাশ করে, যেখানে তারা কোনো দেশের নাগরিকত্বের অধিকার থেকে বঞ্চিত।
মানবাধিকার কর্মী কলিম উল্লাহ উল্লেখ করেন, “রোহিঙ্গারা এখন ভূ-রাজনীতির অনাথ। সবাই সহানুভূতির কথা বলে, কিন্তু কেউ দায়িত্ব নিতে চায় না।” তিনি যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং আঞ্চলিক সংস্থা ASEAN-কে রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধানে আরও দৃঢ় পদক্ষেপ নিতে আহ্বান জানান। একই সঙ্গে বাংলাদেশ সরকার রোহিঙ্গা শিবিরের ধীরে ধীরে বন্ধের পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে, তবে নিরাপদ প্রত্যাবাসনের জন্য মিয়ানমারের সঙ্গে সমন্বয় প্রয়োজন।
জাতিসংঘের পুনর্বাসন কাঠামো অনুসারে, রোহিঙ্গা শরণার্থীদের স্বেচ্ছাসেবী এবং নিরাপদ প্রত্যাবাসন নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত শিবিরে অবস্থান অব্যাহত থাকবে। বাংলাদেশ সরকার ২০২৫ সালের মধ্যে শিবিরের বেশিরভাগ অংশ বন্ধ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে, তবে মিয়ানমারের রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং নিরাপত্তা পরিস্থিতি এই লক্ষ্যকে ঝুঁকির মুখে ফেলেছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমর্থন এবং দ্বিপাক্ষিক আলোচনার ফলাফলই রোহিঙ্গা শরণার্থীদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে।



