ইরানের রাজধানী তেহরানসহ দেশের বিভিন্ন শহরে গত সপ্তাহে বিক্ষোভের পর সরকারী কর্তৃপক্ষ বহু বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বন্ধের আদেশ জারি করেছে। এই পদক্ষেপটি ডিসেম্বরের শেষের দিকে শুরু হওয়া প্রতিবাদে অংশগ্রহণকারী বা সামাজিক মাধ্যমে সমর্থন প্রকাশকারী ব্যবসাগুলিকে লক্ষ্য করে নেওয়া হয়েছে। অর্থনৈতিক সংকটের তীব্রতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সাধারণ নাগরিক ও ব্যবসায়ীরা বাড়তি চাপে আছেন।
বন্দের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলো মূলত এমন ব্যবসা যেগুলো ধর্মঘট পালন করেছিল অথবা বিক্ষোভের প্রতি সমর্থনসূচক পোস্ট শেয়ার করেছিল। কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে কোনো বিশদ ব্যাখ্যা না দিয়ে, বন্ধের নোটিশে উল্লেখ করা হয়েছে যে এই প্রতিষ্ঠানগুলো দেশের আইন লঙ্ঘন করেছে এবং পুলিশি নির্দেশনা মানেনি।
ইরান সরকার এই বন্ধের পেছনের কারণকে স্পষ্টভাবে প্রকাশ না করলেও, প্রকাশিত নোটিশে ‘দেশের নিয়ম লঙ্ঘন’ এবং ‘পুলিশি বিধি না মানার’ অভিযোগ উল্লেখ করা হয়েছে। আইনগত ভিত্তি না দিয়ে সরাসরি ব্যবসা বন্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যা ব্যবসায়িক সম্প্রদায়ের মধ্যে অনিশ্চয়তা বাড়িয়ে দিয়েছে।
এ পর্যন্ত প্রকাশিত তথ্যের মধ্যে ৮১ বছর বয়সী ব্যবসায়ী মোহাম্মদ আলি সাইদিনিয়ার ক্যাফে ও খাদ্য পণ্যের একাধিক ব্র্যান্ড বন্ধ করা হয়েছে। তার মালিকানাধীন জনপ্রিয় ক্যাফে এবং বিভিন্ন খাবারের ব্র্যান্ড দীর্ঘদিনের গ্রাহক ভিত্তি গড়ে রেখেছিল, তবে এখন তারা সরকারী আদেশের ফলে কার্যক্রম বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছে।
ইরানের অর্থনৈতিক অবস্থা ইতিমধ্যে মারাত্মক সংকটে নিমজ্জিত, মুদ্রার অবমূল্যায়ন, বেকারত্বের হার বৃদ্ধি এবং মৌলিক পণ্যের ঘাটতি দেশকে গভীর মন্দার দিকে নিয়ে যাচ্ছে। ব্যবসা বন্ধের ফলে আর্থিক প্রবাহ আরও সংকুচিত হবে, যা সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ও বাজারের স্থিতিশীলতাকে প্রভাবিত করবে।
ইরান সরকার দাবি করেছে যে সাম্প্রতিক বিক্ষোভে তিন হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছে এবং এই হিংসাত্মক ঘটনার পেছনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল সমর্থিত ‘সন্ত্রাসী গোষ্ঠী’ দায়ী। সরকার এই দৃষ্টিকোণ থেকে নিরাপত্তা বাহিনীর কার্যক্রমকে বৈধতা প্রদান করেছে এবং আন্তর্জাতিক সমালোচনার মুখে রক্ষা করার চেষ্টা করছে।
অন্যদিকে, জাতিসংঘ ও বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা নিরাপত্তা বাহিনীর অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের দিকে ইঙ্গিত করে, যেখানে বহু বেসামরিক নাগরিক, শিশুসহ, প্রাণ হারিয়েছে। এই সংস্থাগুলো সরকারকে স্বচ্ছতা ও দায়িত্বশীলতা বজায় রাখতে আহ্বান জানিয়ে আন্তর্জাতিক নজরদারি বাড়ানোর দাবি তুলেছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা উল্লেখ করছেন যে ব্যবসা বন্ধের সিদ্ধান্ত সরকারকে অভ্যন্তরীণ অশান্তি দমন করার পাশাপাশি অর্থনৈতিক চাপকে নিয়ন্ত্রণের একটি কৌশল হিসেবে দেখা যেতে পারে। তবে দীর্ঘমেয়াদে এই পদক্ষেপটি বিক্ষোভের তীব্রতা বাড়াতে পারে, কারণ ব্যবসায়িক সম্প্রদায়ের ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া সামাজিক অসন্তোষকে উসকে দিতে পারে।
বর্তমানে ইরান সরকার কীভাবে এই পরিস্থিতি সামলাবে, তা দেশের রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ওপর নির্ভরশীল। ভবিষ্যতে নিরাপত্তা নীতি, অর্থনৈতিক সংস্কার এবং মানবাধিকার সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক চাপের সমন্বয় কীভাবে গঠন হবে, তা দেশের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা ও জনমতের ওপর প্রভাব ফেলবে।



