বাংলাদেশের কয়েকটি ইসলামিক দল সম্প্রতি এমন একটি নীতি ঘোষণা করেছে, যেখানে তারা নারীদের কাজের পরিমাণ কমানো বা সম্পূর্ণভাবে কাজ থেকে মুক্তি দেওয়ার কথা বলছে। এই ঘোষণাটি দেশের রাজনৈতিক আলোচনায় নতুন দৃষ্টিকোণ যোগ করেছে এবং বিভিন্ন স্তরে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে।
প্রস্তাবিত নীতি ‘সেবামূলক, সুরক্ষামূলক বা স্বস্তিদায়ক’ হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছে, যা নারীদের সামাজিক অবস্থান উন্নত করার ইঙ্গিত দেয়। তবে এই পদ্ধতি নারীদের কর্মজীবনের স্বায়ত্তশাসনকে কীভাবে প্রভাবিত করবে, তা নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছে।
প্রস্তাবের পেছনে একটি মৌলিক অনুমান লুকিয়ে আছে: নারীরা কাজ করতে চায় না। এই ধারণা নারীর কর্মসংস্থান সম্পর্কে সামাজিক ধারণাকে সরলীকরণ করে এবং বাস্তবিক চাহিদা ও আকাঙ্ক্ষাকে উপেক্ষা করে।
বিপরীতভাবে, দেশের বিভিন্ন পেশাগত ক্ষেত্রের নারীরা কাজের প্রতি উচ্চ আগ্রহ প্রকাশ করে। কিছু নারী আরও বেশি কাজ করতে, ক্যারিয়ার গড়ে তুলতে এবং পেশাগত উন্নতি অর্জনে ইচ্ছুক, যা তাদের ব্যক্তিগত লক্ষ্য ও স্বপ্নের অংশ।
কাজের মাধ্যমে নারীরা অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা, আত্মমর্যাদা এবং সামাজিক স্বীকৃতি পায়। কর্মক্ষেত্রের অভিজ্ঞতা তাদের পরিচয় গঠন, দক্ষতা বিকাশ এবং সমাজে সক্রিয় ভূমিকা পালন করার সুযোগ দেয়।
অনেকের জন্য কাজ কেবল আয়ের মাধ্যম নয়; এটি আত্মপরিচয়ের এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ, যেখানে তারা সীমা পরীক্ষা করে, বুদ্ধিমত্তা শাণিত করে এবং সমাজে অবদান রাখে। এই প্রক্রিয়ায় তারা ঐতিহাসিকভাবে সীমাবদ্ধ করা ভূমিকা থেকে বেরিয়ে এসে নিজস্ব স্থান দাবি করে।
‘সুরক্ষার নামে কাজ থেকে বঞ্চনা’কে মুক্তি নয়, বরং নতুন ধরনের নিয়ন্ত্রণ হিসেবে দেখা যেতে পারে। নারীর কর্মসংস্থান সীমিত করা তাদের স্বাধীনতা হ্রাসের সমান, যা সমতা অর্জনের পথে বাধা সৃষ্টি করে।
কাজের অধিকার মানে কাজ না করার অধিকারও অন্তর্ভুক্ত। যারা গৃহস্থালি কাজ, সন্তান লালন-পালন বা অন্যান্য গৃহস্থালি দায়িত্বে মনোনিবেশ করতে চান, তাদের সিদ্ধান্তকে সম্মান ও সামাজিক সহায়তা প্রদান করা উচিত।
‘পছন্দ’ শব্দটি এখানে মূল। যখন রাজনৈতিক দলগুলো নারীদের কাজ না করার কথা ঘোষণা করে, তখন তারা মূলত নারীর জনজীবনে অংশগ্রহণকে শর্তসাপেক্ষ ও আলোচ্য বিষয় হিসেবে উপস্থাপন করে, যেখানে পুরুষের কাজকে স্বাভাবিক ধরা হয়।
এই ধরনের অবস্থান সমাজের সমতা ও ন্যায়বিচারকে প্রশ্নবিদ্ধ করে, কারণ এটি নারীর জনসাধারণে অংশগ্রহণকে বিকল্পিক করে তুলছে। তাই এই নীতি নিয়ে গভীর বিশ্লেষণ প্রয়োজন।
যদি কোনো নারী কাজ করতে চান, সরকারের দায়িত্ব তার কর্মপরিবেশকে নিরাপদ করা, যাতায়াতের সময় নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং কাজের সময় বৈষম্য না করা। কাজ থেকে সরিয়ে দেওয়া নয়, বরং সুরক্ষিত পরিবেশ গড়ে তোলা উচিত।
সরকারের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, যাতে তারা রাস্তায়, গণপরিবহনে বা কর্মস্থলে হেনস্থা, আক্রমণ বা বৈষম্যের শিকার না হয়। এ ধরনের সুরক্ষা কর্মসংস্থানকে উৎসাহিত করবে, না যে তা সীমাবদ্ধ করবে।
নিরাপত্তা বাড়াতে নারীর ঘরে সীমাবদ্ধ করা সমাধান নয়; বরং সমাজের সকল স্তরে সমান অধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিত করা দরকার। আত্মসম্মান ও স্বায়ত্তশাসন কেবল কাজের মাধ্যমে অর্জিত হতে পারে, না যে তা ত্যাগের মাধ্যমে।
ইতিহাসে দেখা যায়, নারীর কর্মসংস্থান সীমিত করা সামাজিক নিয়ন্ত্রণের একটি রূপ, যা আধুনিক সমতা নীতির বিপরীত। এই প্রবণতা পুনরাবৃত্তি না করা জরুরি, যাতে নারীর স্বতন্ত্রতা রক্ষা পায়।
রাজনৈতিকভাবে, এই নীতি আসন্ন নির্বাচনের সময় পার্টিগুলোর ভোটার ভিত্তি গঠনে প্রভাব ফেলতে পারে। নারীর অধিকার সংরক্ষণে সক্রিয় সিভিল সোসাইটি গোষ্ঠী এবং শ্রমিক ইউনিয়নগুলো এই প্রস্তাবের বিরোধিতা করে, যা রাজনৈতিক বিতর্ককে তীব্র করবে।
ভবিষ্যতে, নারীর কর্মসংস্থান সংক্রান্ত নীতি গঠনে নিরাপত্তা, সমতা এবং পছন্দের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা মূল চাবিকাঠি হবে। সরকার যদি এই দিকগুলোকে অগ্রাধিকার দেয়, তবে নারীর সামাজিক অংশগ্রহণ ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন উভয়ই সমৃদ্ধ হবে।



