ড. মুহাম্মদ ইউনূস, প্রধান উপদেষ্টা, মঙ্গলবার (১০ ফেব্রুয়ারি) সন্ধ্যায় জাতির উদ্দেশে এক ব্যাপক ভাষণ দিয়ে জানিয়ে দেন যে, ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের ফলাফল ঘোষিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ক্ষমতা নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতে হস্তান্তর করা হবে। তিনি ভোটারদেরকে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে ভোটকেন্দ্রে গিয়ে ভোটাধিকার প্রয়োগের জন্য আহ্বান জানান।
এই ভাষণটি ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন ও জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের গণভোটের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে দেওয়া হয়। ড. ইউনূস দেশের বিভিন্ন কোণায় নাগরিকদেরকে উৎসবমুখর পরিবেশে ভোট দিতে উৎসাহিত করে, যাতে ভোটদান প্রক্রিয়া একত্রে আনন্দের মুহূর্তে রূপান্তরিত হয়।
প্রধান উপদেষ্টা বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের এমন একটি প্রচারণা উল্লেখ করেন, যা দাবি করে যে ক্ষমতা হস্তান্তর করা হবে না। তিনি এটিকে ভিত্তিহীন ও পরিকল্পিত অপপ্রচার বলে খণ্ডন করে বলেন, সরকারকে সঠিক তথ্যের ভিত্তিতে কাজ করতে হবে।
ড. ইউনূস স্পষ্ট করে জানান, বিজয়ী জনপ্রতিনিধিদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করা মাত্রই অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব শেষ হবে এবং তারা নিজেদের স্বাভাবিক কাজের দিকে ফিরে যাবে। তিনি নতুন সরকারের কাছে দায়িত্ব অর্পণকে একটি গৌরবময় মুহূর্ত হিসেবে বর্ণনা করেন।
ভোটের গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, প্রত্যেক ভোট দেশের দরজা খুলে দেয়ার চাবি। “আপনার মূল্যবান ভোট দিয়ে নতুন বাংলাদেশ গড়ার দরজা খুলে দিন,” তিনি জোর দিয়ে বলেন এবং ভোটারদেরকে চাবিটি সঠিকভাবে ব্যবহার করার আহ্বান জানান।
এই নির্বাচনে রেকর্ডসংখ্যক ৫১টি রাজনৈতিক দল এবং দুই হাজারেরও বেশি প্রার্থী অংশগ্রহণ করবে। ড. ইউনূস উল্লেখ করেন, এই বিশাল অংশগ্রহণ দেশের দীর্ঘদিনের বৈষম্য ও বঞ্চনার বিরুদ্ধে একটি গণঅভ্যুত্থানের সাংবিধানিক প্রকাশ হিসেবে বিবেচিত হবে।
তিনি আরও বলেন, এই ভোট ১৭ বছরের নীরবতা ও বাধাহীন ফ্যাসিবাদের চূড়ান্ত জবাব দেবে। ভোটের মাধ্যমে দেশের যুবক, নারী ও সংগ্রামী জনগণের কণ্ঠস্বর আর কখনো দমন হবে না, এটাই তার দৃঢ় বিশ্বাস।
ড. ইউনূস জানান, নতুন সরকারকে দায়িত্ব অর্পণ করার পর তিনি ও তার সহকর্মীরা আনন্দ ও গর্বের সঙ্গে নিজেদের স্বাভাবিক কাজের দিকে ফিরে যাবেন। এই প্রত্যাশা দেশের রাজনৈতিক পরিবেশে একটি ইতিবাচক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়।
নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার রেকর্ডসংখ্যক আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করেছে। সারা দেশে সিসি ক্যামেরা স্থাপন, কর্মকর্তাদের বডি ক্যামেরা ব্যবহার, পাশাপাশি ড্রোন ও ডগ স্কোয়াডের মাধ্যমে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। এসব ব্যবস্থা অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে নেওয়া হয়েছে।
ড. ইউনূস ভোটারদেরকে ভয়কে পেছনে ফেলে সাহসিকতার সঙ্গে ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার আহ্বান জানান। তিনি জোর দিয়ে বলেন, নিরাপত্তা ব্যবস্থা সঠিকভাবে কাজ করলে ভোটদান প্রক্রিয়া কোনো বাধা ছাড়াই সম্পন্ন হবে।
অন্যদিকে, অন্তর্বর্তী সরকারও একই নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে মন্তব্য করে জানিয়েছে যে, বিশাল আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতি এবং আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার ভোটের স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করার জন্য অপরিহার্য। সরকার দাবি করে যে, এই পদক্ষেপগুলো একটি শান্তিপূর্ণ ও ন্যায়সঙ্গত নির্বাচন নিশ্চিত করবে।
বিশ্লেষকরা অনুমান করছেন, যদি ক্ষমতা হস্তান্তর প্রক্রিয়া নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সম্পন্ন হয় এবং নতুন সরকার সুষ্ঠুভাবে গঠন হয়, তবে ১৭ বছর দীর্ঘ অন্তর্বর্তী শাসনের পর দেশের রাজনৈতিক দৃশ্যপটে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা হবে। এই পরিবর্তন দেশের গণতান্ত্রিক কাঠামোকে শক্তিশালী করে ভবিষ্যতে নীতি-নির্ধারণে অধিক স্বচ্ছতা ও জনমতকে সম্মান জানাতে সহায়তা করবে।
সারসংক্ষেপে, ড. মুহাম্মদ ইউনূসের ভাষণ নির্বাচনের গুরুত্ব, নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং ক্ষমতা হস্তান্তরের সময়সূচি স্পষ্ট করে তুলে ধরেছে, পাশাপাশি ভোটারদেরকে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে ভোট দিতে উৎসাহিত করেছে। দেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ এখন ভোটের ফলাফলের ওপর নির্ভরশীল, যা নতুন বাংলাদেশ গড়ার পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হবে।



