ইন্দোনেশিয়া গাজা অঞ্চলে সর্বোচ্চ ৮,০০০ সৈন্য পাঠানোর পরিকল্পনা প্রকাশ করেছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় গত বছর শেষের দিকে স্বাক্ষরিত সশস্ত্র বিরতির দ্বিতীয় পর্যায়ের অংশ হিসেবে বিবেচিত। গাজা সীমান্তের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, অঞ্চলকে অশস্ত্রীকরণ করা এবং মানবিক সহায়তা প্রদানই মূল লক্ষ্য।
ইন্দোনেশিয়ার সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল মারুলি সিমানজুনতাক জানিয়েছেন, সৈন্যদের প্রশিক্ষণ ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে এবং তারা প্রধানত চিকিৎসা ও প্রকৌশল কাজের জন্য প্রস্তুত করা হবে। প্রশিক্ষণকালে জরুরি চিকিৎসা, শিবির নির্মাণ এবং অবকাঠামো মেরামতের দক্ষতা বাড়ানো হবে।
ইন্দোনেশিয়া সম্প্রতি ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বে গঠিত “বোর্ড অফ পিস”-এ যোগ দিয়েছে। এই বোর্ডটি গত মাসে ঘোষিত হয় এবং গাজা পুনর্গঠন ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার জন্য আন্তর্জাতিক সমন্বয়কারী হিসেবে কাজ করবে। ইন্দোনেশিয়ার অংশগ্রহণ প্রথম দেশের মধ্যে গন্য, যা অঞ্চলের নিরাপত্তা কাঠামোতে নতুন মাত্রা যোগ করবে।
জাতিসংঘের সিকিউরিটি কাউন্সিলের অনুমোদন পেয়ে ইন্দোনেশিয়া আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনীর (ISF) গঠন দায়িত্ব পেয়েছে। ISF গাজা সীমান্তে নিরাপত্তা বজায় রাখা, হামাসের অস্ত্রনিরস্ত্রীকরণ এবং অঞ্চলের সামরিকীকরণ রোধে কাজ করবে। এই মিশনটি গাজা অঞ্চলের দীর্ঘমেয়াদী শান্তি প্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে বিবেচিত।
বোর্ডের প্রথম সভা ১৯ ফেব্রুয়ারি ওয়াশিংটনে নির্ধারিত হয়েছে। সভায় গাজায় নতুন প্রযুক্তিগত প্যালেস্টাইনি সরকার গঠন, পরবর্তী পুনর্নির্মাণ কাজের পরিকল্পনা এবং আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনীর কার্যক্রমের বিশদ আলোচনা হবে। এই মিটিংয়ের ফলাফল গাজা পুনরুদ্ধারের সময়সূচি নির্ধারণে প্রভাব ফেলবে।
ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট প্রবোও সোবিয়ান্তো এই সিদ্ধান্তের পেছনে দেশের বৃহত্তম মুসলিম জাতি হিসেবে গাজা স্থিতিশীল করতে অবদান রাখার ইচ্ছা উল্লেখ করেছেন। তবে দেশের কিছু ইসলামিক গোষ্ঠী ডোনাল্ড ট্রাম্পের বোর্ডে অংশগ্রহণকে সমালোচনা করেছে, কারণ যুক্তরাষ্ট্রের ইসরায়েল-গাজা সংঘাতে ভূমিকা নিয়ে দেশীয় জনমত তীব্রভাবে বিরোধপূর্ণ।
প্রবোও সোবিয়ান্তো যুক্তি দিয়েছেন, গাজা অঞ্চলে শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা দুই-রাষ্ট্র সমাধানের পথে অগ্রগতি ঘটাবে। তিনি বলেন, ইন্দোনেশিয়ার অংশগ্রহণ কেবল সামরিক নয়, মানবিক ও পুনর্নির্মাণ কাজেও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ হবে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে ইন্দোনেশিয়া গাজা পুনরুদ্ধারে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মডেল হিসেবে কাজ করতে চায়।
ইসরায়েলীয় পাবলিক ব্রডকাস্টার কান জানিয়েছে, রাফাহ ও খান ইউনিসের মধ্যে দক্ষিণ গাজার একটি এলাকা ইতিমধ্যে ইন্দোনেশিয়ার সেনাবাহিনীর জন্য ব্যারাক্স নির্মাণের জন্য নির্ধারিত হয়েছে। এই স্থানে কয়েক হাজার সৈন্যের জন্য সাময়িক শিবির গড়ে তোলা হবে, যা প্রশিক্ষণ ও মানবিক সহায়তা কার্যক্রমের কেন্দ্রবিন্দু হবে।
তুরস্ক ও পাকিস্তানসহ অন্যান্য মুসলিম দেশও গাজায় শান্তি রক্ষাকারী সেনা পাঠানোর কথা বিবেচনা করছে। তবে তারা স্পষ্ট করে বলেছে, তাদের মিশন শুধুমাত্র শান্তি রক্ষা পর্যন্ত সীমাবদ্ধ থাকবে এবং হামাসের অস্ত্রনিরস্ত্রীকরণে সরাসরি অংশ নেবে না। এই পার্থক্য গাজা নিরাপত্তা কাঠামোর বহুমুখী প্রকৃতি তুলে ধরছে।
হামাস এখনও অস্ত্র ত্যাগে অনিচ্ছুক, আর ইসরায়েল গাজার কিছু অংশ দখল করে রেখেছে। এই পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনীর কাজ জটিল হয়ে দাঁড়াবে, কারণ উভয় পক্ষের নিরাপত্তা উদ্বেগ এবং মানবিক সংকট সমাধান একসাথে পরিচালনা করতে হবে।
বিশ্লেষকরা উল্লেখ করছেন, ইন্দোনেশিয়ার এই উদ্যোগ গ্লোবাল নিরাপত্তা কাঠামোতে নতুন গতিপথ তৈরি করতে পারে, বিশেষ করে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলোর মধ্যে সমন্বিত শান্তি মিশনের উদাহরণ হিসেবে। গাজা অঞ্চলের পুনর্গঠন, সীমান্ত নিরাপত্তা এবং দুই-রাষ্ট্র সমাধানের দিকে অগ্রসর হওয়া আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক প্রচেষ্টার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হতে পারে।
গাজায় ইন্দোনেশিয়ার সৈন্য মোতায়েনের সুনির্দিষ্ট সময়সূচি ও ভূমিকা এখনও চূড়ান্ত হয়নি, তবে প্রেসিডেন্ট প্রবোও সোবিয়ান্তোর দৃঢ় সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে মিশনটি শীঘ্রই বাস্তবায়িত হবে বলে আশা করা হচ্ছে। গাজা পুনর্গঠন ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমন্বিত প্রচেষ্টা এখনই গুরুত্বপূর্ণ।



