ফেব্রুয়ারি ১ থেকে ১০ তারিখের মধ্যে রাজনৈতিক সহিংসতা এবং সাংবাদিকদের ওপর আক্রমণ তীব্রতর হয়েছে, যা ১২ ফেব্রুয়ারি নির্ধারিত জাতীয় নির্বাচনের পূর্বে দেশের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে উদ্বেগজনক করে তুলেছে। মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সলিশ কেন্দ্র (ASK) এর ডকুমেন্টেশন ইউনিটের রেকর্ড অনুযায়ী, এই দশ দিনে মোট ৫৮টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে, যার ফলে ৪৮৯ জন আহত এবং দুইজন নিহত হয়েছে। ঘটনাগুলি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে, এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে ভোটের উত্তেজনা ও দলীয় সংঘর্ষকে মূল কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
ASK এর প্রকাশ্য বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ফেব্রুয়ারি প্রথম দশকের তুলনায় জানুয়ারি শেষের দশ দিনে (২১-৩১ জানুয়ারি) ৪৯টি সহিংসতার ঘটনা নথিভুক্ত করা হয়েছিল, যেখানে ৪১৪ জন আহত এবং চারজন নিহত হয়েছিলেন। এই তুলনা দেখায় যে নির্বাচনের আগের দুই সপ্তাহে সহিংসতার সংখ্যা এবং শিকারীর সংখ্যা উভয়ই বৃদ্ধি পেয়েছে।
বিস্তারিত বিশ্লেষণে জানুয়ারি প্রথম দশকে (১-১০ জানুয়ারি) আটটি ঘটনা নথিভুক্ত হয়, যার ফলে ২৬ জন আহত এবং পাঁচজন নিহত হয়েছেন। পরের দশকে (১১-২০ জানুয়ারি) ১৮টি ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে, যার ফলে ১৭৬ জন আহত এবং দুইজন নিহত হয়েছেন। এই তথ্যগুলো থেকে স্পষ্ট হয় যে বছরের শুরুতে সহিংসতার হার ধীরে ধীরে বাড়ছে, এবং জানুয়ারি মাসের মাঝামাঝি সময়ে শিকারীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
সেইসাথে, সাংবাদিকদের ওপর আক্রমণও বাড়ছে বলে ASK রিপোর্ট করেছে। মিডিয়া সূত্রের ভিত্তিতে, ডিসেম্বর ২০২৫ মাসে ১১ জন সাংবাদিক আক্রমণের শিকার হন, আর জানুয়ারি ২০২৬-এ এই সংখ্যা ১৬ জনে বৃদ্ধি পায়। ফেব্রুয়ারি প্রথম দশকে, দেশব্যাপী অন্তত ৪৭ জন সাংবাদিককে লক্ষ্য করে আক্রমণ করা হয়েছে, যা পূর্ববর্তী মাসের তুলনায় স্পষ্টতই বৃদ্ধি পেয়েছে।
বিশেষ করে ৭ ফেব্রুয়ারি একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা ঘটেছে। অনলাইন সংবাদপোর্টাল “বাংলাদেশ টাইমস”-এর ২১ জন সাংবাদিককে তাদের কর্মস্থল থেকে জোরপূর্বক তুলে নিয়ে একটি সামরিক শিবিরে নিয়ে যাওয়া হয়। শিবিরে নিয়ে যাওয়ার পর প্রায় দুই ঘণ্টা পরই তাদের মুক্তি দেওয়া হয়। এই ঘটনার ফলে সাংবাদিক স্বাধীনতার ওপর উদ্বেগ বাড়ে এবং মিডিয়া সংস্থাগুলোর মধ্যে আতঙ্কের স্রোত দেখা দেয়।
ASK এর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, জানুয়ারি ২০২৬-এ রাজনৈতিক সহিংসতা ডিসেম্বর ২০২৫-এর তুলনায় বৃদ্ধি পেয়েছে এবং ফেব্রুয়ারি মাসে এই প্রবণতা অব্যাহত রয়েছে। শিকারীর সংখ্যা, বিশেষ করে আহত ও নিহতের সংখ্যা, ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে, যা নির্বাচনী পরিবেশকে অস্থির করে তুলতে পারে।
সংগঠনটি সকল সংশ্লিষ্ট পক্ষকে আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখতে এবং মৌলিক মানবাধিকারকে সম্মান করতে আহ্বান জানায়। রাজনৈতিক দল, নিরাপত্তা বাহিনী এবং নির্বাচনী কমিশনকে এই ধরনের সহিংসতা রোধে তৎপরতা দেখাতে এবং সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পদক্ষেপ নিতে বলা হয়েছে।
ASK এর এই ডেটা প্রকাশের পর, দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক গোষ্ঠী ও নাগরিক সমাজের সংগঠনগুলোও সহিংসতার ধারাবাহিকতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। যদিও সরকারী পক্ষ থেকে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য পাওয়া যায়নি, তবে সংস্থার আহ্বানকে গুরুত্ব দিয়ে নিরাপত্তা ব্যবস্থার পুনর্বিবেচনা করা প্রত্যাশিত।
এই পরিস্থিতি নির্বাচনের ফলাফলে প্রভাব ফেলতে পারে বলে বিশ্লেষকরা সতর্কতা প্রকাশ করছেন। যদি সহিংসতা এবং সাংবাদিক আক্রমণ নিয়ন্ত্রণে না আসে, তবে ভোটারদের অংশগ্রহণের ইচ্ছা কমে যেতে পারে এবং নির্বাচনী প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও ন্যায়পরায়ণতা প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে।
অতএব, আইন ও সলিশ কেন্দ্রের ডেটা নির্দেশ করে যে রাজনৈতিক উত্তেজনা এবং মিডিয়া দমন উভয়ই বাড়ছে, যা দেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার জন্য একটি চ্যালেঞ্জ হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে। সকল স্টেকহোল্ডারকে এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা জোর দিয়ে বলা হয়েছে।



