আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রস্তুতিতে, সরকার মঙ্গলবার (১০ ফেব্রুয়ারি) থেকে শুরু করে ১৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ছয় দিন ড্রোন উড্ডয়নে সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। এই নিষেধাজ্ঞা সারা দেশের বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) এর অনুমতি ছাড়া সকল ধরণের বেসামরিক ড্রোনের ব্যবহারকে বাধা দেয়। নিরাপত্তা উদ্বেগ এবং নির্বাচনী পরিবেশকে সুরক্ষিত করার লক্ষ্যেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের জনসংযোগ বিভাগে কাজ করা মুহাম্মদ কাউছার মাহমুদ এই বিষয়টি গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেছেন। তিনি উল্লেখ করেন যে নিষেধাজ্ঞা সরকারী বিজ্ঞপ্তি ও সংশ্লিষ্ট নোটিশের মাধ্যমে ইতিমধ্যে প্রকাশিত হয়েছে। এই নোটিশে ড্রোন উড্ডয়নের সময়সীমা ও শর্তাবলী স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
নিষেধাজ্ঞা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও প্রতিরক্ষা সংস্থার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। পুলিশ, রেঞ্জার, সিএনএস এবং সামরিক বাহিনীর ড্রোন ব্যবহার এই সময়ে স্বাভাবিকভাবে চালু থাকবে। তাই নিরাপত্তা সংক্রান্ত জরুরি অপারেশন বা গোয়েন্দা কাজের জন্য ড্রোনের ব্যবহার অব্যাহত থাকবে।
গবেষণা, জরিপ, কৃষি পর্যবেক্ষণ এবং সরকারি ইভেন্টের সম্প্রচারের মতো বিশেষ উদ্দেশ্যে ড্রোন চালাতে হলে বেবিচকের অনুমোদন নিতে হবে। সংশ্লিষ্ট সংস্থা বা ব্যক্তিরা নির্ধারিত ফরমে আবেদন করে অনুমোদন পেলে সীমিত সময়ের জন্য ড্রোন ব্যবহার করতে পারবে। অনুমোদন প্রক্রিয়ার জন্য প্রয়োজনীয় নথি ও নিরাপত্তা পরিকল্পনা জমা দিতে হবে।
ড্রোন উড্ডয়নের নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘন করলে তা ‘বেসামরিক বিমান চলাচল আইন ২০১৭’ এর ধারা ২৪ অনুযায়ী অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। ধারা ২৪ অনুযায়ী শাস্তি আর্থিক জরিমানা এবং কারাদণ্ড উভয়ই অন্তর্ভুক্ত করতে পারে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থা লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে দ্রুত তদন্ত ও শাস্তি প্রদান করবে।
বিরোধী দল ও কিছু বিশ্লেষক এই নিষেধাজ্ঞাকে নির্বাচনী সময়ে তথ্যের প্রবাহ সীমিত করার সম্ভাবনা হিসেবে দেখছেন। তারা দাবি করেন যে ড্রোনের ব্যবহার স্বচ্ছতা ও পর্যবেক্ষণ বাড়াতে সহায়ক হতে পারে। তবে সরকার নিরাপত্তা ঝুঁকি ও সম্ভাব্য অপব্যবহারকে অগ্রাধিকার দিয়ে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
নির্বাচনকালীন নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে সরকারী সূত্র জোর দেয়। ড্রোনের মাধ্যমে সম্ভাব্য গোপনীয়তা লঙ্ঘন বা সাইবার আক্রমণ রোধে এই নিষেধাজ্ঞা প্রয়োজনীয় বলে বিবেচনা করা হয়েছে। ফলে ভোটার ও প্রার্থীদের নিরাপদ পরিবেশ বজায় রাখতে এই ব্যবস্থা সমর্থন পেয়েছে।
ড্রোন নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করার জন্য বেবিচক দেশের বিভিন্ন বিমানবন্দর ও এয়ারপোর্টে নজরদারি বাড়াবে। বিশেষ করে বড় শহর ও নির্বাচনী কেন্দ্রের আশেপাশে ড্রোন সনাক্তকরণ ব্যবস্থা স্থাপন করা হবে। লঙ্ঘনকারীকে তৎক্ষণাৎ থামিয়ে শাস্তি আরোপের জন্য জরুরি দল গঠন করা হয়েছে।
ড্রোন ব্যবহারকারী পেশাদার ফটোগ্রাফার, সংবাদ সংস্থা এবং হবি উড্ডয়নকারী সকলকে এই সময়ে তাদের কার্যক্রম স্থগিত করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অনুমোদন ছাড়া কোনো ড্রোন উড়ালে তা অবৈধ বলে গণ্য হবে এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি আইনি দায়ের মুখোমুখি হবে। এই নির্দেশনা সামাজিক মিডিয়া ও সংবাদপত্রে ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয়েছে।
অনুমোদন প্রক্রিয়ার সময়সীমা সংক্ষিপ্ত রাখা হয়েছে যাতে জরুরি গবেষণা ও কৃষি কাজের জন্য বাধা না সৃষ্টি হয়। আবেদনকারীকে ড্রোনের মডেল, উড্ডয়ন উচ্চতা এবং কাজের উদ্দেশ্য স্পষ্টভাবে উল্লেখ করতে হবে। অনুমোদন পাওয়ার পর নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ সম্পন্ন না করলে অনুমতি বাতিল করা হতে পারে।
নিষেধাজ্ঞা শেষ হওয়ার পর ড্রোন উড্ডয়ন পুনরায় স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসবে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে। তবে সরকার ভবিষ্যতে নিরাপত্তা পরিস্থিতি অনুযায়ী অতিরিক্ত সীমাবদ্ধতা আরোপের সম্ভাবনা খোলা রেখেছে। এই নীতি নির্বাচনী প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও নিরাপত্তা বজায় রাখতে একটি মডেল হিসেবে কাজ করতে পারে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন যে ড্রোনের ব্যবহার সীমিত করা ভোটারদের তথ্যপ্রাপ্তি ও নির্বাচনী পর্যবেক্ষণে প্রভাব ফেলতে পারে। তবে একই সঙ্গে এটি অবৈধ গোপনীয়তা লঙ্ঘন ও সাইবার হুমকি থেকে রক্ষা করার একটি প্রাকৃতিক ব্যবস্থা। তাই উভয় দিকের সমতা বজায় রাখতে সরকারকে সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।
নির্বাচনের আগে নিরাপত্তা সংক্রান্ত এই ধরনের পদক্ষেপ সাধারণত আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে বিবেচিত হয়। অন্যান্য দেশের নির্বাচনেও অনুরূপ ড্রোন নিষেধাজ্ঞা প্রয়োগের উদাহরণ দেখা যায়। তাই বাংলাদেশের এই সিদ্ধান্তকে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা পর্যবেক্ষণ করবেন।
সারসংক্ষেপে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রস্তুতিতে সরকার ছয় দিনের জন্য ড্রোন উড্ডয়নে কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে, যা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী ও প্রতিরক্ষা বাহিনীর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয় এবং অনুমোদন প্রাপ্ত ক্ষেত্রে ব্যতিক্রমী ব্যবহার অনুমোদিত। লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে আইনি শাস্তি নিশ্চিত করা হয়েছে, এবং এই পদক্ষেপের রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা প্রভাবের ওপর বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি উন্মোচিত হয়েছে।



