মন্ত্রণালয় উপদেষ্টা ফরিদা আখতার মঙ্গলবার সকাল মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে অন্তর্বর্তী সরকারের স্বল্প মেয়াদে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতে গৃহীত পদক্ষেপ ও ফলাফল উপস্থাপন করেন। তিনি উল্লেখ করেন, বিদ্যুৎ বিলের ওপর ২০ শতাংশ রিবেট এবং মোট ১০০ কোটি টাকা ভর্তুকি প্রদান করে উৎপাদন ব্যয় কমানো হয়েছে। এছাড়া সামাজিক সুরক্ষা ভিজিএফ (VGF) কর্মসূচির আওতায় নিবন্ধিত নারীদের সংখ্যা ১৩,২৬,৪৮৬ থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ১৫ লক্ষে পৌঁছেছে, এবং প্রথমবারের মতো সুন্দরবন ও হাওর অঞ্চলের নারীরাও এই সুবিধা পাচ্ছেন।
ইলিশ সংরক্ষণের জন্য পদ্মা‑মেঘনা অববাহিকায় ছয়টি অভয়াশ্রম গড়ে তোলা হয়েছে এবং বঙ্গোপসাগরে ৭,০০০ বর্গকিলোমিটার এলাকা প্রজনন ক্ষেত্র হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। দেশীয় বিলুপ্তপ্রায় মাছের রক্ষায় বর্তমানে ৬৬৯টি অভয়াশ্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। হালদা নদীকে ‘মৎস্য হেরিটেজ’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে, যা দেশের অর্থনীতিতে বছরে ৮০০ কোটি টাকার বেশি অবদান রাখে বলে অনুমান করা হচ্ছে। কাপ্তাই হ্রদের সাতটি অভয়াশ্রমের মাধ্যমে মাছের উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে, তবে অবৈধ দখল ও দূষণের ঝুঁকি নিয়ে উপদেষ্টা উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
গবাদি পশু ক্ষেত্রে পিপিআর (প্রোডাকশন রেজিস্ট্রেশন) নির্মূলে ৩ কোটি ৬১ লাখের বেশি রেকর্ড করা হয়েছে এবং ক্ষুরারোগের বিরুদ্ধে ৪৬ লক্ষের বেশি টিকা প্রদান করা হয়েছে। মোট ১৭টি রোগের জন্য ৫৭ কোটি ডোজের বেশি টিকা উৎপাদন করা হয়েছে, যা পশুস্বাস্থ্যের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স (এএমআর) মোকাবিলায় স্টুয়ার্ডশিপ গাইডলাইন ও স্ট্যান্ডার্ড ট্রিটমেন্ট গাইডলাইন চালু করা হয়েছে, পাশাপাশি ‘জুনোটিক’ রোগ শনাক্তের জন্য একটি বিশেষ ভেটেরিনারি পাবলিক হেলথ ল্যাবরেটরি গঠন করা হয়েছে।
রমজান মাসে সাধারণ জনগণের স্বস্তি নিশ্চিত করতে ২৬ দিনব্যাপী ভ্রাম্যমাণ বিক্রয়কেন্দ্র স্থাপন করা হবে, যেখানে ড্রেসড ব্রয়লার প্রতি কেজি ২৪৫ টাকা, গরুর মাংস ৬৫০ টাকা, দুধ প্রতি লিটার ৮০ টাকা এবং ডিম প্রতি পিস ৮ টাকা দরে বিক্রি করা হবে। এই কেন্দ্রগুলো ধীরে ধীরে বাড়িয়ে আরও বেশি এলাকায় পৌঁছানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
ব্রাজিলে অনুষ্ঠিত কপ‑৩০ সম্মেলনে মন্ত্রণালয় প্রথমবারের মতো অংশগ্রহণ করে আন্তর্জাতিক মঞ্চে দেশের মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ নীতি উপস্থাপন করেছে। এই অংশগ্রহণকে সরকার আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে দেশের কৃষি‑খাদ্য নিরাপত্তা লক্ষ্য অর্জনের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখেছে।
বিপক্ষের কিছু রাজনৈতিক দল ও বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন, যদিও নীতিগুলো ইতিবাচক দিক দেখাচ্ছে, তবে কাপ্তাই হ্রদের অবৈধ দখল ও দূষণ সমস্যার সমাধান না হলে দীর্ঘমেয়াদী টেকসইতা নিশ্চিত করা কঠিন হবে। তারা আরও দাবি করেন, ভিজিএফ সুবিধা সঠিকভাবে পৌঁছাতে তদারকি ব্যবস্থা শক্তিশালী করা দরকার, যাতে সব প্রান্তিক কৃষক ও নারীরই সমানভাবে উপকার পাওয়া যায়।
মন্তব্যে উপদেষ্টা ফরিদা আখতার জোর দেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে গৃহীত পদক্ষেপগুলো মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতের উৎপাদনশীলতা, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং সামাজিক সুরক্ষার সমন্বিত উন্নয়নে সহায়ক হবে। তিনি ভবিষ্যতে এই নীতিগুলোকে আরও বিস্তৃত করে দেশের খাদ্য স্বাবলম্বন ও রপ্তানি সক্ষমতা বৃদ্ধি করার পরিকল্পনা প্রকাশ করেন।
এই ঘোষণার পর সরকারী কর্মকর্তারা উল্লেখ করেন, পরবর্তী ধাপে নীতিগুলোর বাস্তবায়ন পর্যবেক্ষণ, প্রভাব বিশ্লেষণ এবং প্রয়োজনীয় সমন্বয় করা হবে, যাতে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতের দীর্ঘমেয়াদী টেকসইতা নিশ্চিত করা যায়।



