১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন আসন্ন, এবং এই সময়ে চীনের কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক পদক্ষেপগুলো দ্রুত বাড়ছে বলে আন্তর্জাতিক সংস্থা রয়টার্সের একটি প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। ত্রয়োদশ নির্বাচনের প্রস্তুতি, ভোটার তালিকা আপডেট এবং পার্টি ক্যাম্পেইন সবই দেশের রাজনৈতিক পরিবেশকে তীব্র করে তুলছে। এই প্রেক্ষাপটে চীন কীভাবে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে তার প্রভাব বিস্তার করছে, তা বিশ্লেষণ করা গুরুত্বপূর্ণ।
রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে শেখ হাসিনার সরকার পতনের পর ঢাকা-ভারত এ সম্পর্কের মধ্যে যে উত্তেজনা দেখা দিয়েছে, তা চীনের জন্য সুযোগের দরজা খুলে দিয়েছে। চীন দ্রুত তার বিনিয়োগ প্রকল্প এবং কূটনৈতিক কার্যক্রম বাড়িয়ে তুলেছে, যাতে নতুন সরকার গঠনের সময় তার অবস্থান শক্তিশালী হয়।
শেখ হাসিনা বর্তমানে দিল্লিতে অবস্থান করার ফলে বাংলাদেশের সাধারণ জনগণের মধ্যে ভারত এ বিরোধী অনুভূতি তীব্রতর হয়েছে। এই মনোভাবের উত্থান চীনের জন্য নতুন দরজা খুলে দিয়েছে, কারণ বেইজিং এখন বাংলাদেশের অভ্যন্তরে তার কৌশলগত অবস্থান বাড়াতে সক্ষম হচ্ছে।
বিশ্লেষকরা সতর্ক করে জানিয়েছেন যে, ভৌগোলিকভাবে ভারত এ মতো বড় প্রতিবেশীকে পুরোপুরি এড়িয়ে চলা বাংলাদেশের জন্য বাস্তবিকভাবে সম্ভব নয়। তবে নতুন সরকার গঠনের পর চীনকে বেশি গুরুত্ব দেওয়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, যা ভবিষ্যতে দুই দেশের সম্পর্কের দিকনির্দেশনা পরিবর্তন করতে পারে।
শেখ হাসিনার দীর্ঘ ১৫ বছরের শাসনকালে ঢাকা-ভারত এ সম্পর্ক অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ছিল, কিন্তু এখন আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ হওয়ায় এবং তিনি নির্বাসনে থাকায় ঐতিহাসিক সমীকরণ বদলে গেছে। এই পরিবর্তন চীনের জন্য কূটনৈতিকভাবে সুবিধাজনক পরিবেশ তৈরি করেছে।
বিএনপি এবং জামায়াত-এ-ইসলামি, যারা নির্বাচনের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী দল, ঐতিহাসিকভাবে ভারত এ সঙ্গে শীতল সম্পর্ক বজায় রেখেছে। এই দলগুলোর উত্থান চীনের কূটনৈতিক প্রভাবকে আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে, কারণ তারা ভারত এ থেকে দূরে সরে যাওয়ার সম্ভাবনা বেশি।
চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন সম্প্রতি বাংলাদেশের রাজনৈতিক নেতা এবং সাংবাদিকদের সঙ্গে একাধিক বৈঠক করেছেন, যেখানে বিলিয়ন ডলারের অবকাঠামো প্রকল্প নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এই বৈঠকগুলোতে চীন দেশের উন্নয়ন পরিকল্পনায় কীভাবে অংশ নিতে চায়, তা স্পষ্ট হয়েছে।
এছাড়া, ভারত এ সীমান্তের নিকটবর্তী অঞ্চলে ড্রোন উৎপাদন কারখানা স্থাপনের জন্য চীনের সঙ্গে একটি প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। এই চুক্তি কেবল সামরিক সহযোগিতা নয়, বরং প্রযুক্তি স্থানান্তর এবং স্থানীয় কর্মসংস্থান বৃদ্ধির দিকেও গুরুত্ব দেয়।
ক্রীড়া ও ভিসা সংক্রান্ত সমস্যার ফলে সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক আরও অবনতি দেখেছে। ক্রিকেট সিরিজের বাতিল এবং ভিসা প্রক্রিয়ার জটিলতা উভয় দেশের জনগণের মধ্যে অবিশ্বাস বাড়িয়ে তুলেছে।
অর্থনৈতিক দিক থেকে চীন বাংলাদেশের জন্য অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। গত দশকে চীন বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ বাণিজ্যিক অংশীদার হিসেবে রয়ে গেছে, যেখানে বার্ষিক দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য প্রায় ১৮ বিলিয়ন ডলার। দেশের আমদানিকৃত পণ্যের ৯৫ শতাংশই চীনের উৎপাদিত, যা বাংলাদেশের বাজারে চীনের আধিপত্যকে স্পষ্ট করে।
শেখ হাসিনার প্রস্থানের পর চীনা কোম্পানিগুলো বাংলাদেশে শত শত মিলিয়ন ডলার মূল্যের বিনিয়োগ করেছে, যা আদানি গ্রুপের মতো বড় ভারত এ প্রতিষ্ঠানের তুলনায় বেশি দৃশ্যমান। এই বিনিয়োগগুলো অবকাঠামো, শক্তি এবং ডিজিটাল সেবা ক্ষেত্রকে লক্ষ্য করে করা হয়েছে।
সেন্টার ফর সোশ্যাল অ্যান্ড ইকোনমিক প্রগ্রেসের সিনিয়র ফেলো কনস্ট্যান্টিনো জাভিয়েরের মতে, ভারত এ সঙ্গে বাংলাদেশের বর্তমান সংকট চীনকে উভয়ই প্রকাশ্য ও গোপনভাবে তার প্রভাব বাড়ানোর সুযোগ দিচ্ছে। তিনি উল্লেখ করেন যে, চীন কূটনৈতিক মিটিং, বাণিজ্যিক চুক্তি এবং নিরাপত্তা সহযোগিতার মাধ্যমে তার অবস্থানকে শক্তিশালী করছে।
ভবিষ্যতে যদি নতুন সরকার চীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখে, তবে তা দেশের কূটনৈতিক ভারসাম্য এবং অর্থনৈতিক নীতিতে বড় পরিবর্তন আনতে পারে। তবে ভৌগোলিক সীমাবদ্ধতা এবং ভারত এ’র সঙ্গে পারস্পরিক নির্ভরতা এখনও বাংলাদেশের কূটনৈতিক কৌশলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এই পরিস্থিতি নির্বাচনের ফলাফলের ওপর নির্ভরশীল, যা দেশের ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা নির্ধারণ করবে।



