27 C
Dhaka
Tuesday, February 10, 2026
Google search engine
Homeশিক্ষা১৯৫০‑এর দশকে ঢাকায় প্রকাশনা ও মুদ্রণ শিল্পের বিকাশ

১৯৫০‑এর দশকে ঢাকায় প্রকাশনা ও মুদ্রণ শিল্পের বিকাশ

১৯৫০‑এর দশকে পুরাতন ঢাকার সংকীর্ণ গলিগুলোতে মুদ্রণযন্ত্রের ধ্বনি, কাগজের গুঞ্জন এবং টাইপসেটারদের চিৎকার শোনা যেত। গলির কোণায় ছোট ছোট দোকানে কাগজের গাদা খুলে ওজন করা হতো, আর মুদ্রণযন্ত্রের গুঞ্জন শহরের রক্তস্রোতের মতো প্রবাহিত হতো।

সেই সময়ের দোকানগুলো ছাদ পর্যন্ত বই, কাগজ এবং স্টেশনারি দিয়ে ভরা থাকত। প্রকাশকরা কাগজের ডিলারদের সঙ্গে দর-কষাকষি করতেন, শিক্ষকরা নতুন পাঠ্যপুস্তক হাতে নিতেন, আর শিশুরা সর্বশেষ গোয়েন্দা উপন্যাসের জন্য দৌড়াত। এই সব কার্যকলাপ একসাথে শহরের জ্ঞানীয় পরিবেশ গড়ে তুলেছিল।

প্রথম দশকের পূর্ব পাকিস্তানকে বলা যায় উথাল-পাথাল, উচ্চাকাঙ্ক্ষা এবং স্বয়ংসম্পূর্ণতার মিশ্রণ। তবে সবকিছুর মধ্যে সবচেয়ে দৃঢ় ছিল মুদ্রণ—প্রতিটি নতুন ধারণা, প্রতিটি রাজনৈতিক আলোচনার সূচনা কাগজে রূপ নিত। এই সময়ে প্রকাশনা, মুদ্রণ ও বিক্রয় একত্রে দেশের জ্ঞানভান্ডার গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

ঢাকার প্রকাশনা কর্মী—প্রকাশক, মুদ্রণকর্মী, বই বিক্রেতা, চিত্রশিল্পী, শিক্ষক এবং সরকারি কর্মচারী—একটি সমন্বিত নেটওয়ার্ক গঠন করে। তারা একসাথে পাঠ্যপুস্তক, গবেষণা গ্রন্থ এবং সাধারণ পাঠ্যসামগ্রী তৈরি করে, যা নতুন জাতির শৈল্পিক ও বৌদ্ধিক পরিচয় গড়ে তুলতে সহায়তা করে।

কাগজের সরবরাহের ক্ষেত্রে বাম্বু বনের ব্যবহার, অফসেট মেশিনের ক্রয় এবং বৈদেশিক মুদ্রা তালিকার নিয়ন্ত্রণের মতো চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়েছিল। তবু শিশুদের জীবনী, ঐতিহাসিক উপন্যাস এবং শিক্ষামূলক পুস্তক দ্রুত বাজারে পৌঁছাতে পারত, কারণ পাঠকের চাহিদা সরবরাহ শৃঙ্খলকে দ্রুত পরিবর্তন করত।

বইয়ের চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কাগজের চাহিদাও বেড়েছে, ফলে কাগজের ব্যবসায়ী, মুদ্রণঘর এবং বইয়ের দোকানগুলো একে অপরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করত। এই পারস্পরিক নির্ভরতা একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ শিল্প চেইন তৈরি করেছিল, যা স্বাধীনতা অর্জনের আগে থেকেই ঢাকাকে মুদ্রণকেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিল।

স্বাধীনতার পূর্বে ঢাকার ঐতিহাসিক বাজার এলাকায় ‘বাংলা বাজার’ নামে পরিচিত একটি সমাবেশ গড়ে উঠেছিল। এখানে প্রকাশক, মুদ্রণকর্মী, বই বিক্রেতা, পাঠ্যপুস্তক বিক্রেতা, কাগজের ডিলার এবং স্টেশনারি বিক্রেতা সবই একসাথে কাজ করত। এই বাজারের সমন্বিত কাঠামো লেখক ও পাঠকের জন্য সহজ প্রবেশদ্বার তৈরি করত।

বাজারের সুবিধা ছিল যে একটি হাতে লেখা পাণ্ডুলিপি সহজে টাইপসেটার, প্রুফরিডার, মুদ্রণযন্ত্র, বাইন্ডার এবং কভার ডিজাইনারের কাছে পৌঁছাতে পারত। শেষ পর্যন্ত বই বিক্রেতা জানত কোন স্কুল বা থানা কতটি কপি ক্রেডিটে নিতে পারে, ফলে প্রকাশনা প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন হতো।

ঢাকায় সক্রিয় প্রকাশনা ঘরগুলোর তালিকায় মজিদ পাবলিশিং হাউস, মুল্লিক ব্রাদার্স, ওয়াদুদ পাবলিকেশন, পুর্বাচল প্রকাশনী, আজাদ পাবলিশিং হাউস, বার্ডস অ্যান্ড বুকস, কিতাবিস্তান, মাজু পাবলিকেশন, স্ট্যান্ডার্ড পাবলিকেশন এবং আজিজ বুক হাউস অন্তর্ভুক্ত। কিছু ঘর প্রধানত স্কুলের পাঠ্যপুস্তক ও রেফারেন্স বইয়ের ওপর মনোযোগ দিত, অন্যরা সাহিত্য, শিশুদের গল্প এবং ঐতিহাসিক বর্ণনা প্রকাশে বিশেষজ্ঞ ছিল।

এই প্রকাশনা ঘরগুলো কেবল বই ছাপাতেই নয়, নতুন লেখকদের স্বীকৃতি দিতে, চিত্রশিল্পীদের কাজকে কভার আর্টে রূপ দিতে এবং শিক্ষকদের পাঠ্যপুস্তকের গুণগত মান বজায় রাখতে ভূমিকা রাখত। ফলে দেশের শিক্ষাব্যবস্থা ও সাংস্কৃতিক আলোচনার ভিত্তি মজবুত হয়।

আজকের পাঠকরা যদি ঐতিহাসিক প্রকাশনা শিল্পের ধারাকে বুঝতে চান, তবে পুরনো বাজারের গলিতে হাঁটা, ঐতিহ্যবাহী কাগজের দোকান পরিদর্শন এবং সেই সময়ের প্রকাশনা ঘরের পুরনো ক্যাটালগ দেখার মাধ্যমে বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারেন। আপনার কি কোনো পুরনো বইয়ের স্মৃতি আছে, যা আপনাকে সেই সময়ের মুদ্রণ গন্ধে ফিরিয়ে দেয়?

৯১/১০০ ১টি সোর্স থেকে যাচাইকৃত।
আমরা ছাড়াও প্রকাশ করেছে: ডেইলি স্টার
শিক্ষা প্রতিবেদক
শিক্ষা প্রতিবেদক
AI-powered শিক্ষা content writer managed by NewsForge
RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments