মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মেরিটাইম অ্যাডমিনিস্ট্রেশন গত সোমবার হরমুজ প্রণালীতে চলাচলকারী মার্কিন পতাকাবাহী বাণিজ্যিক জাহাজের ক্যাপ্টেনদের ইরানের জলসীমা থেকে যতটা সম্ভব দূরে থাকা এবং ইরানি বাহিনীর অননুমোদিত চড়ে ওঠা থেকে বিরত থাকার নির্দেশ জারি করেছে। এই নির্দেশনা যুক্তরাষ্ট্র‑ইরান সম্পর্কের বর্তমান উত্তেজনা এবং সাম্প্রতিক পারস্পরিক নিরাপত্তা আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে প্রকাশিত হয়েছে।
নতুন নির্দেশিকায় স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, যদি ইরানি সশস্ত্র বাহিনী কোনো মার্কিন পতাকাবাহী জাহাজে চড়ে ওঠে, তবে ক্রুদের তাৎক্ষণিকভাবে প্রতিরোধের জন্য কোনো শক্তি ব্যবহার করা উচিত নয়। তবে এই নিষেধাজ্ঞা বোঝায় না যে ইরানি কর্মীদের চড়ে ওঠা অনুমোদিত বা স্বীকৃত। ক্যাপ্টেনদের জাহাজের নিরাপত্তা বজায় রাখতে যথাযথ সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে, তবে কোনো শারীরিক সংঘর্ষে জড়িয়ে না পড়তে হবে।
দিকনির্দেশনায় আরও উল্লেখ করা হয়েছে, হরমুজ প্রণালীতে পূর্বমুখী যাত্রা করার সময় জাহাজগুলোকে ওমানের জলসীমার কাছাকাছি রুট বেছে নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এই বিকল্প পথটি ইরানের নিকটবর্তী জলসীমা থেকে দূরত্ব বজায় রাখতে সহায়তা করবে এবং সম্ভাব্য নিরাপত্তা ঝুঁকি কমাবে। মেরিটাইম অ্যাডমিনিস্ট্রেশন জোর দিয়ে বলেছে, নৌচলাচলের নিরাপত্তা কোনোভাবে আপস করা যাবে না।
এই নির্দেশনা ওমানের রাজধানী তাবেকের কাছে অনুষ্ঠিত এক পরোক্ষ পারমাণবিক আলোচনার পর প্রকাশিত হয়। শুক্রবার ওমানে ইরান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদের মধ্যে গোপনীয় আলোচনার একটি পর্যায় শেষ হওয়ার পর মেরিটাইম অ্যাডমিনিস্ট্রেশন এই সতর্কতা জারি করে। উভয় পক্ষের কূটনৈতিক সংলাপের মাঝেও নৌপরিবহন নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
গত কয়েক সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে হুমকি-ধামকির তীব্রতা বৃদ্ধি পেয়েছে। দু’দেশের সামরিক বাহিনীর চলাচল এবং বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপত্তা নিয়ে পারস্পরিক অভিযোগের ধারাবাহিকতা দেখা গিয়েছে, যা উভয় দেশের মধ্যে যুদ্ধের ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলেছে। বিশেষ করে ইরানীয় নৌবাহিনীর কিছু জাহাজের অপ্রত্যাশিত নিকটবর্তী চলাচলকে যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর সতর্কতা হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
গত বছর জুনে ইসরাইলের ইরানের ওপর বোমা হামলার পর ইরানের একজন আইনপ্রণেতা হরমুজ প্রণালী বন্ধ করার পরামর্শ দেন। যদিও সেই প্রস্তাবটি বাস্তবায়িত হয়নি, তবে এটি হরমুজের কৌশলগত গুরুত্বকে পুনরায় তুলে ধরেছে। হরমুজ প্রণালী পারস্য উপসাগরকে ভারত মহাসাগরের সঙ্গে সংযুক্ত করে, এবং বিশ্বব্যাপী তেল ও গ্যাসের প্রায় এক-চতুর্থাংশ এই সংকীর্ণ পথ দিয়ে অতিক্রম করে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র বিভাগ হরমুজকে “বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তেল চোকপয়েন্ট” হিসেবে বর্ণনা করে। এই পথের বন্ধ হয়ে যাওয়া বা সীমিত হওয়া গ্লোবাল তেল বাজারে সরবরাহের ঘাটতি এবং দামের অস্থিরতা বাড়াতে পারে। তাই যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর জন্য হরমুজের নিরাপদ ব্যবহার কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক উভয় দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ।
একজন আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষক মন্তব্য করেছেন, “হরমুজ প্রণালীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কেবল মার্কিন বাণিজ্যিক জাহাজের জন্য নয়, বরং গ্লোবাল জ্বালানি সরবরাহের স্থিতিশীলতার জন্যও অপরিহার্য। ইরানের সঙ্গে চলমান কূটনৈতিক সংলাপের মাঝেও নৌপরিবহনের ঝুঁকি কমাতে এই ধরনের নির্দেশনা প্রয়োজনীয়।” বিশ্লেষক আরও যোগ করেন, “ওমানের জলসীমার মাধ্যমে বিকল্প রুট গ্রহণ করা যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত নমনীয়তা বাড়াবে এবং সম্ভাব্য সংঘর্ষের সম্ভাবনা হ্রাস করবে।”
পরবর্তী সপ্তাহগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনী এবং বাণিজ্যিক জাহাজের ক্যাপ্টেনরা নতুন রুট পরিকল্পনা ও নিরাপত্তা প্রোটোকল অনুসরণ করবে। মেরিটাইম অ্যাডমিনিস্ট্রেশন উল্লেখ করেছে যে, ইরানের সঙ্গে সরাসরি সংলাপের ফলাফল এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতিক্রিয়া হরমুজের ভবিষ্যৎ ব্যবহারকে প্রভাবিত করবে। একই সঙ্গে, ওমানের সঙ্গে সমন্বয় বাড়িয়ে নিরাপদ নেভিগেশন নিশ্চিত করা হবে।
সারসংক্ষেপে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নতুন নির্দেশনা হরমুজ প্রণালীর নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ধারাবাহিকতা রক্ষার লক্ষ্যে নেওয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। ইরানীয় জলসীমা থেকে দূরে চলা, ওমানের জলসীমা ব্যবহার এবং অননুমোদিত চড়ে ওঠা থেকে বিরত থাকা—এই তিনটি মূল নীতি যুক্তরাষ্ট্রের নৌপরিবহন নীতি পুনর্গঠনকে নির্দেশ করে। ভবিষ্যতে কূটনৈতিক আলোচনার অগ্রগতি এবং নিরাপত্তা পরিস্থিতি এই নির্দেশনার কার্যকারিতা নির্ধারণ করবে।



