বাংলাদেশ সরকার ও মার্কিন সরকার গতকাল হোয়াইট হাউসে স্বাক্ষরিত পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তির মাধ্যমে ১৫ বছরের সময়সীমায় যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি ও জ্বালানি পণ্যের ক্রয় নিশ্চিত করেছে। এই চুক্তি দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ককে আরও গভীর করার লক্ষ্যে করা হয়েছে।
চুক্তির অধীনে বাংলাদেশ সরকার আগামী পনেরো বছরে যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রায় ৩.৫ বিলিয়ন ডলার মূল্যের কৃষি পণ্য এবং ১৫ বিলিয়ন ডলার মূল্যের জ্বালানি পণ্য ক্রয় করবে। এই পরিমাণে শস্য, দুগ্ধ, মাংস, ফলফলাদি এবং তেলজাত পণ্যের পাশাপাশি প্রাকৃতিক গ্যাস ও তেল অন্তর্ভুক্ত।
এছাড়াও, রাষ্ট্রায়ত্ত বিমান সংস্থা বিমানের ১৪টি নতুন জেটের ক্রয় পরিকল্পনা চুক্তির মোট মূল্যকে বাড়িয়ে তুলবে। interim সরকার এই সপ্তাহে ৩০,০০০ থেকে ৩৫,০০০ কোটি টাকার (প্রায় ২.৪৬ থেকে ২.৮৭ বিলিয়ন ডলার) মূল্যের বয়িং জেটের চুক্তি স্বাক্ষরের কথা জানিয়েছে।
হোয়াইট হাউসের যৌথ বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে যে বাংলাদেশ সরকার যুক্তরাষ্ট্রের শিল্প ও কৃষি পণ্যের জন্য বিশেষ বাজার প্রবেশাধিকার প্রদান করবে। এতে রাসায়নিক, চিকিৎসা যন্ত্র, যন্ত্রপাতি ও গাড়ির অংশ, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) সরঞ্জাম, জ্বালানি পণ্য, সয়াবিন পণ্য, দুগ্ধ, গরুর মাংস, পোল্ট্রি এবং বাদাম ও ফলের মতো পণ্য অন্তর্ভুক্ত।
মার্কিন সরকার বাংলাদেশ থেকে রপ্তানি হওয়া পণ্যের শুল্ক হার ২০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৯ শতাংশে নামিয়ে আনবে, এবং কিছু পণ্যের জন্য শূন্য শুল্কের সুবিধা প্রদান করবে। এই হ্রাসের ফলে দু’দেশের বাণিজ্যিক প্রবাহে উল্লেখযোগ্য স্বস্তি আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।
চুক্তিতে একটি বিশেষ ব্যবস্থা যুক্ত করা হয়েছে, যার মাধ্যমে নির্দিষ্ট পরিমাণের বাংলাদেশি টেক্সটাইল ও পোশাক পণ্য যুক্তরাষ্ট্রে শুল্কমুক্তভাবে রপ্তানি করা যাবে। এই সুবিধা যুক্তরাষ্ট্রের তুলা ও কৃত্রিম ফাইবার ইনপুটের রপ্তানির সঙ্গে যুক্ত থাকবে, যা উভয় দেশের উৎপাদন শৃঙ্খলে পারস্পরিক সুবিধা তৈরি করবে।
এই চুক্তি সম্পন্ন হতে প্রায় নয় মাসের আলোচনার পর স্বাক্ষরিত হয়েছে; আলোচনার সূচনা এপ্রিল ২০২৫ সালে হয়েছিল। আলোচনার সময় মার্কিন সরকার পূর্বে বাংলাদেশি রপ্তানির ওপর ৩৭ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছিল, যা বাণিজ্যিক উত্তেজনা বাড়িয়ে তুলেছিল।
মার্কিন সরকার বাংলাদেশি পণ্যের জন্য যে ৩৭ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছিল, তা মূলত যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ শিল্প রক্ষার উদ্দেশ্যে নেওয়া হয়েছিল। তবে পরবর্তী আলোচনার মাধ্যমে উভয় পক্ষই শুল্ক হ্রাসের মাধ্যমে বাণিজ্যিক ভারসাম্য পুনরুদ্ধার করতে চেয়েছে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে বাংলাদেশি রপ্তানির সবচেয়ে বড় বাজার হিসেবে রয়ে গেছে। এই চুক্তি দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করবে এবং বাংলাদেশের রপ্তানি আয় বৃদ্ধি করতে সহায়তা করবে।
চুক্তিটি ২০১৩ সালে স্বাক্ষরিত US‑Bangladesh Trade and Investment Cooperation Forum Agreement (TICFA) এর ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। TICFA পূর্বে দুই দেশের বাণিজ্যিক সহযোগিতা ও বিনিয়োগের কাঠামো স্থাপন করেছিল, যা এই নতুন চুক্তির জন্য ভিত্তি সরবরাহ করেছে।
বাংলাদেশ সরকার চুক্তির অংশ হিসেবে অ-শুল্ক বাধা কমাতে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এতে যুক্তরাষ্ট্রের গাড়ি নিরাপত্তা মান স্বীকৃতি, চিকিৎসা যন্ত্র ও ফার্মাসিউটিক্যাল পণ্যের জন্য FDA সার্টিফিকেশন গ্রহণ, এবং পুনর্নির্মিত পণ্যের ওপর নিষেধাজ্ঞা অপসারণ অন্তর্ভুক্ত। এছাড়া শুল্ক প্রক্রিয়া ডিজিটালাইজেশন এবং কাস্টমস পদ্ধতি আধুনিকায়নের পরিকল্পনা রয়েছে।
বিশ্লেষকরা উল্লেখ করছেন, এই চুক্তি বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ও কৃষি উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চ মানের প্রযুক্তি ও কৃষি পণ্যের প্রবেশে স্থানীয় উৎপাদনকারীরা প্রতিযোগিতামূলক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হবে। তবে শুল্ক হ্রাস ও বাজার প্রবেশাধিকার বৃদ্ধির ফলে রপ্তানি পরিমাণে স্থিতিশীল বৃদ্ধি প্রত্যাশিত।
সারসংক্ষেপে, বাংলাদেশ সরকার ও মার্কিন সরকারের মধ্যে স্বাক্ষরিত ১৫ বছরের বাণিজ্য চুক্তি জ্বালানি, কৃষি, টেক্সটাইল এবং উচ্চ প্রযুক্তি পণ্যের ক্ষেত্রে নতুন সুযোগ তৈরি করবে। শুল্ক হ্রাস, শূন্য শুল্ক সুবিধা এবং অ-শুল্ক বাধা কমানোর মাধ্যমে দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্কের পরিধি বিস্তৃত হবে, যা উভয় পক্ষের অর্থনৈতিক স্বার্থে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।



