পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরে সোমবার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী একটি নৌযানের ওপর লিথাল কাইনেটিক স্ট্রাইক চালায়। আক্রমণে দুইজনকে হত্যা করা হয় এবং আরেকজনকে গুরুতর আঘাতের পর বেঁচে থাকা জানানো হয়। বেঁচে থাকা ব্যক্তির উদ্ধার কাজের জন্য মার্কিন কোস্টগার্ডকে নির্দেশ দেওয়া হয়।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ কমান্ড (US SOUTHCOM) অনুসারে, লক্ষ্যবস্তু নৌযানটি মাদক পাচার কার্যক্রমে জড়িত বলে সন্দেহ করা হয়েছিল। তবে এই দাবিকে সমর্থনকারী কোনো প্রমাণ প্রকাশ করা হয়নি। কমান্ডের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, স্ট্রাইকটি ‘লিথাল কাইনেটিক’ প্রযুক্তি ব্যবহার করে পরিচালিত হয়েছে, যা লক্ষ্যবস্তুকে তাত্ক্ষণিকভাবে নিষ্ক্রিয় করতে সক্ষম।
আক্রমণের পরপরই US SOUTHCOM নৌযানে বেঁচে থাকা ব্যক্তির জন্য অনুসন্ধান ও উদ্ধার (SAR) ব্যবস্থা সক্রিয় করার নির্দেশ কোস্টগার্ডকে পাঠায়। কোস্টগার্ডের দল দ্রুত নিকটবর্তী এলাকায় পৌঁছে বেঁচে থাকা ব্যক্তিকে উদ্ধার করার চেষ্টা করছে। উদ্ধার কাজের অগ্রগতি ও সুনির্দিষ্ট অবস্থান সম্পর্কে এখনো কোনো সরকারি আপডেট পাওয়া যায়নি।
এই ঘটনার পূর্বে, গত সপ্তাহে পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আরেকটি নৌযানে একই ধরনের আক্রমণ চালায় এবং দুইজনকে নিহত করে। উভয় ঘটনার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের মাদক পাচার সংক্রান্ত অভিযোগের ভিত্তি একই, তবে কোনো স্বতন্ত্র তদন্তের ফলাফল প্রকাশিত হয়নি। এই ধারাবাহিকতা অঞ্চলীয় নিরাপত্তা পরিবেশে উদ্বেগের সঞ্চার করেছে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কার্যক্রমের তীব্রতা বৃদ্ধি পেতে দেখা যায়, বিশেষ করে লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চলে। বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন, এই ধরনের আক্রমণ আন্তর্জাতিক নৌচালনা ও বাণিজ্যিক শিপিংকে প্রভাবিত করতে পারে এবং সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর কূটনৈতিক সম্পর্কের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে। তবে, যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক ব্যাখ্যা এখনো প্রকাশিত হয়নি।
বছরের শুরুর দিকে ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাসে রাতের আঁধারে একটি রক্তক্ষয়ী অপারেশন ঘটে, যেখানে দেশের প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে অপহরণ করা হয়। সেই ঘটনার পর থেকে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নির্দেশে পরিচালিত নৌযানের ওপর তিনটি আক্রমণ ঘটেছে বলে US SOUTHCOM জানায়। এই তথ্য অঞ্চলীয় নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক নীতি সম্পর্কে নতুন প্রশ্ন উত্থাপন করেছে।
আঞ্চলিক দেশগুলো, বিশেষ করে পেরু ও চিলি, এই আক্রমণকে আন্তর্জাতিক আইন ও সমুদ্রের স্বাধীনতা সংক্রান্ত আলোচনার প্রেক্ষাপটে দেখছে। কিছু সরকার যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপকে ‘অবৈধ হস্তক্ষেপ’ হিসেবে সমালোচনা করেছে এবং আন্তর্জাতিক আদালতে আপিলের সম্ভাবনা উল্লেখ করেছে। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থকরা দাবি করেন, মাদক পাচার দমন করা আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার জন্য অপরিহার্য।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর এই ক্রমবর্ধমান হস্তক্ষেপের পটভূমিতে, যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর ‘লিথাল কাইনেটিক স্ট্রাইক’ প্রযুক্তি সম্প্রতি উন্নত করা হয়েছে বলে জানা যায়। এই প্রযুক্তি লক্ষ্যবস্তুকে উচ্চ গতি ও নির্ভুলতা সহ ধ্বংস করতে সক্ষম, যা প্রচলিত বোমা বা গুলি থেকে আলাদা। তবে, মানবিক ক্ষতি ও নাগরিক প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
অধিকন্তু, যুক্তরাষ্ট্রের কোস্টগার্ডের উদ্ধার মিশনকে সমর্থন করার জন্য আন্তর্জাতিক নৌবাহিনীর সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে। কিছু দেশ ইতিমধ্যে মানবিক সহায়তা ও চিকিৎসা সেবা প্রদান করতে প্রস্তুতিবদ্ধ, তবে নিরাপত্তা পরিস্থিতি স্থিতিশীল না হওয়ায় কার্যক্রমে সীমাবদ্ধতা দেখা দিতে পারে।
এই ঘটনার পর, যুক্তরাষ্ট্রের ডিপ্লোম্যাটিক চ্যানেলগুলোতে আঞ্চলিক অংশীদারদের সঙ্গে আলোচনা চালু হয়েছে। কূটনৈতিক সূত্র অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা মাদক পাচার মোকাবেলায় সমন্বিত আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টার প্রয়োজনীয়তা জোর দিচ্ছেন, তবে একই সঙ্গে মানবিক সুরক্ষা ও আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইন মেনে চলার আহ্বান জানাচ্ছেন।
সারসংক্ষেপে, পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক আক্রমণ দুইজনের মৃত্যু এবং একজনের বেঁচে থাকা ঘটিয়েছে, যার পর কোস্টগার্ডকে উদ্ধার কাজের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এই আক্রমণকে যুক্তরাষ্ট্র মাদক পাচার সংক্রান্ত সন্দেহের ভিত্তিতে চালিয়েছে, যদিও প্রমাণের অভাব রয়েছে। একই অঞ্চলে সাম্প্রতিক সময়ে একই ধরনের দুইটি আক্রমণ ঘটেছে, এবং ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্টের অপহরণের পর থেকে মোট তিনটি আক্রমণ রেকর্ড করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এই পদক্ষেপকে সমালোচনা ও সমর্থনের মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে, এবং ভবিষ্যতে সমুদ্রের নিরাপত্তা ও মানবিক সুরক্ষা নিশ্চিত করার জন্য কূটনৈতিক সমন্বয় প্রয়োজন হবে।



