মার্কিন সরকার এবং বাংলাদেশ সরকার সোমবার নতুন বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষরের পর, যুক্তরাষ্ট্রে আমদানি করা কিছু বাংলাদেশি পোশাক ও টেক্সটাইল পণ্যের শুল্ক হ্রাসের সিদ্ধান্ত জানিয়েছে। এই চুক্তির আওতায় মার্কিন শুল্ক হার ২০% থেকে ১৯% এ কমবে, এবং নির্দিষ্ট পণ্যগুলো শুল্কমুক্ত হবে। পরিবর্তে ঢাকা যুক্তরাষ্ট্রের বিস্তৃত পণ্যশ্রেণীর জন্য বাজার খুলবে।
বাংলাদেশের পোশাক শিল্প দেশের অর্থনীতির মূল স্তম্ভ, যা বিশ্বে চীন পরেই দ্বিতীয় বৃহত্তম রপ্তানিকারক। রপ্তানি আয়ের ৮০%‑এর বেশি এই সেক্টর থেকে আসে এবং প্রায় চার মিলিয়ন কর্মীর কর্মসংস্থান নিশ্চিত করে। তাই শুল্ক হ্রাস ও শুল্কমুক্তির সুযোগ শিল্পের প্রতিযোগিতা ক্ষমতা বাড়াবে বলে আশা করা হচ্ছে।
গত বছর এপ্রিল ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বে মার্কিন সরকার বিশ্ববাজারে ব্যাপক শুল্ক আরোপের পর, বাংলাদেশ সরকার দীর্ঘমেয়াদী আলোচনায় লিপ্ত হয়। এই আলোচনার ফলস্বরূপ, উভয় পক্ষের বাণিজ্যিক সম্পর্ককে শক্তিশালী করার লক্ষ্যে নতুন চুক্তি তৈরি হয়েছে। উভয় সরকারই এই চুক্তিকে পারস্পরিক অর্থনৈতিক সংযোগ বাড়ানোর এবং বাজারে “অপ্রতিদ্বন্দ্বী প্রবেশাধিকার” প্রদানকারী হিসেবে বর্ণনা করেছে।
চুক্তির মূল শর্তের মধ্যে রয়েছে মার্কিন শুল্ক হার ২০% থেকে ১৯% এ হ্রাস, পাশাপাশি নির্দিষ্ট কিছু পোশাক ও টেক্সটাইল পণ্যের শুল্কমুক্তি। এই শুল্কমুক্ত পণ্যগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের উৎপাদিত তুলা ও কৃত্রিম ফাইবার ব্যবহার করে তৈরি পণ্য অন্তর্ভুক্ত। শুল্কমুক্তির পরিমাণ নির্ধারিত হবে কতটুকু টেক্সটাইল যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাংলাদেশে রপ্তানি করা হয় তার ওপর ভিত্তি করে।
বাংলাদেশ সরকার এই চুক্তির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি ও শিল্প পণ্যের জন্য “গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকারমূলক বাজার প্রবেশাধিকার” প্রদান করবে। এতে যুক্তরাষ্ট্রের রাসায়নিক, চিকিৎসা যন্ত্রপাতি, গাড়ির অংশ, সয়াবিন পণ্য এবং মাংসের মতো পণ্যের রপ্তানি সহজ হবে। এই পণ্যগুলো বাংলাদেশের বাজারে প্রবেশের জন্য পূর্বে নির্ধারিত শুল্ক ও কোটা হ্রাস পাবে।
অধিকন্তু, বাংলাদেশ সরকার যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য, ওষুধ, গাড়ি নিরাপত্তা ও নির্গমন মানদণ্ড স্বীকৃতি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এই স্বীকৃতি উভয় দেশের পণ্যবাণিজ্যকে সহজতর করবে এবং মানদণ্ডের পার্থক্যজনিত বাধা কমাবে। ফলে আমদানি প্রক্রিয়া দ্রুততর হবে এবং খরচ কমবে বলে আশা করা হচ্ছে।
চুক্তিতে বাংলাদেশ সরকার আন্তর্জাতিক স্বীকৃত শ্রম অধিকার রক্ষা এবং পরিবেশ সংরক্ষণের জন্য অতিরিক্ত পদক্ষেপ নেবে বলে উল্লেখ করেছে। শ্রমিকদের নিরাপত্তা ও কাজের শর্ত উন্নত করার জন্য নতুন নীতি প্রণয়ন করা হবে। একই সঙ্গে টেকসই উৎপাদন ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মান অনুসরণ করা হবে।
বাণিজ্য চুক্তির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল বাংলাদেশ সরকার যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি, বিমান ও জ্বালানি পণ্যের জন্য বিলিয়ন ডলারের ক্রয় নিশ্চিত করবে। এই প্রতিশ্রুতি উভয় দেশের শিল্প ও সেবা খাতের জন্য দীর্ঘমেয়াদী চাহিদা তৈরি করবে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের রপ্তানি পোর্টফোলিওতে বাংলাদেশ একটি স্থিতিশীল বাজার হিসেবে অবস্থান করবে।
এই চুক্তি উভয় দেশের অর্থনৈতিক নীতির সমন্বয়কে নির্দেশ করে, যেখানে বাংলাদেশ তার রপ্তানি ভিত্তিক শিল্পকে বৈশ্বিক বাজারে আরও প্রতিযোগিতামূলক করতে চায়, আর মার্কিন সরকার তার পণ্যশ্রেণীর জন্য নতুন বাজার উন্মুক্ত করতে চায়। শুল্ক হ্রাস এবং শুল্কমুক্ত পণ্যের অন্তর্ভুক্তি উভয় পক্ষের জন্য বাণিজ্যিক সুবিধা বাড়াবে বলে বিশ্লেষকরা অনুমান করছেন।
দীর্ঘমেয়াদে, এই চুক্তি বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের রপ্তানি গন্তব্য বৈচিত্র্যকরণে সহায়তা করবে এবং যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চ মানের কাঁচামাল ব্যবহার বাড়াবে। একই সঙ্গে, যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি ও শিল্প পণ্যের চাহিদা বাড়ার ফলে দু’দেশের বাণিজ্য ভারসাম্য উন্নত হবে।
চুক্তি স্বাক্ষরের পর, বাংলাদেশ সরকার এবং মার্কিন সরকার উভয়ই সংশ্লিষ্ট শিল্প সংস্থা ও ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর সঙ্গে সমন্বয় করে বাস্তবায়ন পরিকল্পনা তৈরি করবে। শুল্ক হ্রাসের প্রভাব এবং নতুন বাজার প্রবেশের সুবিধা পর্যবেক্ষণ করে ভবিষ্যতে অতিরিক্ত সমন্বয় করা হতে পারে।
সারসংক্ষেপে, নতুন বাণিজ্য চুক্তি বাংলাদেশের পোশাক ও টেক্সটাইল শিল্পকে যুক্তরাষ্ট্রের কাঁচামাল ও বাজারের সঙ্গে সংযুক্ত করে, শুল্ক হ্রাসের মাধ্যমে রপ্তানি খরচ কমাবে এবং উভয় দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ককে গভীর করবে। এই পদক্ষেপের ফলে দু’দেশের অর্থনৈতিক বৃদ্ধিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে।



