ক্রাউন সিমেন্ট (ক্রাউন সিমেন্ট) এবং প্রথম আলো (প্রথম আলো) যৌথভাবে আয়োজন করা “অভিজ্ঞতার আলো” অনুষ্ঠানে দেশের বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও জনবুদ্ধিজীবী প্রফেসর রেহমান সোবহানকে প্রধান অতিথি হিসেবে স্বাগত জানানো হয়েছে। ৯০ বছর বয়সী সোবহান আজকের অনুষ্ঠানে তার জীবনের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত ও দেশের গঠনমূলক কাজগুলো নিয়ে আলোচনা করেছেন। অনুষ্ঠানটি ঢাকা শহরের একটি সম্মানিত হলে অনুষ্ঠিত হয় এবং উপস্থিত দর্শকদের মধ্যে শিক্ষাবিদ, নীতি নির্ধারক ও সাংবাদিকরা অন্তর্ভুক্ত ছিলেন।
এই ইভেন্টটি ক্রাউন সিমেন্টের সামাজিক দায়িত্বের অংশ হিসেবে এবং প্রথম আলোর সাংস্কৃতিক প্রচারাভিযানের ধারাবাহিকতা হিসেবে পরিকল্পিত হয়। উভয় সংস্থা দেশের ইতিহাস ও সংস্কৃতির সংরক্ষণে অবদান রাখতে এই ধরনের আলোচনাকে গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচনা করে। অনুষ্ঠানে সোবহানের দীর্ঘায়ু ও বিশাল অভিজ্ঞতা তুলে ধরার জন্য বিশেষ সেশন রাখা হয়।
প্রফেসর রেহমান সোবহান ১২ মার্চ ১৯৩৫ সালে জন্মগ্রহণ করেন। তার জন্মের রেকর্ড মূলত একটি পুরনো নার্সিং হোমে সংরক্ষিত ছিল, যা পরবর্তীতে ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল; তাই তিনি পরিবারিক সূত্রে তথ্য সংগ্রহ করে তার জন্মের সঠিক স্থান নিশ্চিত করেন। সোবহানের পিতার নাম খন্দকার ফজলে সোবহান, এবং পরিবারটি মুর্শিদাবাদ জেলার অন্তর্গত।
সোবহান পরিবারে প্রাচীন ঐতিহাসিক গৌরবের দাবি রয়েছে; তিনি উল্লেখ করেন যে তার ত্রিশতম পূর্বপুরুষের নাম প্রথম খলিফা হজরত আবু বকর (রা.)। যদিও এই তথ্যের ঐতিহাসিক নির্ভরযোগ্যতা নিশ্চিত করা কঠিন, তবে এটি পারিবারিক ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে উল্লেখযোগ্য।
১৯৬০-এর দশকে সোবহান স্বাধিকার আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশ নেন এবং পরে মুক্তিযুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তিনি স্বাধীনতার সংগ্রামের সময় নীতি নির্ধারণে অংশগ্রহণের পাশাপাশি দেশের অর্থনৈতিক ভিত্তি গড়ে তোলার জন্য গবেষণা ও পরামর্শ প্রদান করেন।
স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য হিসেবে সোবহান দেশের দীর্ঘমেয়াদী উন্নয়ন পরিকল্পনা তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। এই দায়িত্বের মাধ্যমে তিনি কৃষি, শিল্প ও বাণিজ্য খাতে সমন্বিত নীতি প্রণয়নে সহায়তা করেন।
১৯৯০ সালে গঠিত অস্থায়ী সরকারের অন্যতম উপদেষ্টা হিসেবে সোবহান দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পুনর্গঠনে অংশ নেন। তিনি সেই সময়ের রাজনৈতিক অস্থিরতা ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় নীতি প্রস্তাব করেন, যা পরবর্তীতে দেশের স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সহায়তা করে।
সোবহান দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক পরিবর্তন, যেমন ১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থান থেকে ২০২৪ সালের বর্তমান রাজনৈতিক পরিবেশ পর্যন্ত, সরাসরি প্রত্যক্ষ করেছেন। তিনি এই সময়কালে দেশের অর্থনৈতিক নীতি, সামাজিক উন্নয়ন ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের পরিবর্তনগুলো পর্যবেক্ষণ করে বিশ্লেষণ করেছেন।
একজন বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ হিসেবে সোবহান বহু গবেষণা ও প্রকাশনা রচনা করেছেন, যা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক নীতি গঠনে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলেছে। তার বিশ্লেষণ ও পরামর্শ সরকার, বেসরকারি সংস্থা ও আন্তর্জাতিক দাতাদের মধ্যে ব্যাপকভাবে স্বীকৃত।
অভিজ্ঞতার আলোতে সোবহানের উপস্থিতি তরুণ নীতি নির্ধারক ও গবেষকদের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস হিসেবে কাজ করেছে। তিনি নিজের অভিজ্ঞতা থেকে শিখে নেওয়া শিক্ষা ও দৃষ্টিভঙ্গি ভাগ করে নিয়ে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে দেশের উন্নয়নের পথে দিকনির্দেশনা দিতে চেয়েছেন।
প্রফেসর সোবহানের বক্তব্য অনুযায়ী, দেশের অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা অর্জনের জন্য দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা, মানবসম্পদ উন্নয়ন ও সুশাসন নিশ্চিত করা অপরিহার্য। তিনি বর্তমান নীতি গঠনে ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে সমন্বিত পদ্ধতির প্রয়োজনীয়তা জোর দিয়ে বলেছেন।
এই অনুষ্ঠানটি সোবহানের দীর্ঘায়ু ও অবদানের প্রতি সম্মান জানিয়ে শেষ হয়েছে এবং ভবিষ্যতে দেশের নীতি ও অর্থনৈতিক দিকনির্দেশনা গঠনে তার মতামতকে গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।



