বাংলাদেশ সরকার গঠন করা অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসনের ৫৫০ দিন পূর্ণ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তার কার্যকারিতা ও সীমাবদ্ধতা নিয়ে বিশদ আলোচনা শুরু হয়েছে। সরকার গঠন, নীতি বাস্তবায়ন এবং জনমত গঠন প্রক্রিয়ার মূল দিকগুলোকে কেন্দ্র করে বিশ্লেষক, অর্থনীতিবিদ ও সমাজবিজ্ঞানীরা সমান্তরালভাবে মতামত প্রকাশ করছেন।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ইতিহাসে প্রায়ই “সন্ধিক্ষণ” হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এই পর্যায়গুলোতে ক্ষমতার পরিবর্তন ও নীতি পুনর্গঠনের সুযোগ দেখা যায়, যা দেশের ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে। বর্তমান প্রশাসনের সময়কাল প্রায় ১৮ মাস, যা পূর্বের বেশ কয়েকটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের তুলনায় দীর্ঘতম বলে বিবেচিত।
নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ ডগলাস নর্থের মতে, ইতিহাসের মোড় পরিবর্তনের সর্বোত্তম সময় হল যখন জনসাধারণের পরিবর্তনের প্রত্যাশা জ্যামিতিকভাবে বৃদ্ধি পায়। তিনি এই সময়কে “ইতিহাসের গতিপথ বদলানোর উৎকৃষ্ট সময়” বলে উল্লেখ করেছেন। দেশের নাগরিক যখন পরিবর্তনের সম্ভাবনা অনুভব করে, তখন তাদের চাহিদা ও প্রত্যাশা দ্রুত বাড়ে, যা সরকারকে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে বাধ্য করে।
অন্যদিকে, আমেরিকান রাষ্ট্রবিজ্ঞানী টেড রবার্ট গার তার “রিলেটিভ ডিপ্রাইভেশন” তত্ত্বে রাজনৈতিক অস্থিরতার মূল কারণকে বিদ্যমান ব্যবস্থার প্রতি আপেক্ষিক বঞ্চনা হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। বাংলাদেশে সাম্প্রতিক অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের জনপ্রিয়তা মূলত বিদ্যমান রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কাঠামোর প্রতি অসন্তোষের প্রতিক্রিয়া হিসেবে দেখা যায়। এই তত্ত্ব অনুসারে, যদি জনমত পরিবর্তনের সুযোগকে যথাযথভাবে ব্যবহার না করা হয়, তবে তা সামাজিক অস্থিরতা বাড়াতে পারে।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান চ্যালেঞ্জ হল ভঙ্গুর অর্থনৈতিক অবস্থা এবং প্রাতিষ্ঠানিক অকার্যকারিতা। দেশের জিডিপি বৃদ্ধির হার ধীরগতিতে চললেও মুদ্রাস্ফীতি, বেকারত্ব এবং দারিদ্র্যের হার এখনও উচ্চ সীমায় রয়েছে। সরকার এই সমস্যাগুলো মোকাবেলায় বিভিন্ন আর্থিক ও কাঠামোগত সংস্কার পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে, তবে বাস্তবায়নের গতি ও ফলাফল নিয়ে মতবিরোধ রয়ে গেছে।
একই সঙ্গে, রাষ্ট্রের সক্ষমতা প্রমাণের প্রচেষ্টা এবং সামাজিক চুক্তি পুনর্গঠনের মধ্যে পারস্পরিক বিরোধ দেখা দিচ্ছে। ক্ষমতা, সম্পদ ও শ্রমের বণ্টন পুনর্বিন্যাসের মাধ্যমে নাগরিক ও রাষ্ট্রের মধ্যে নতুন সমঝোতা গড়ে তোলার লক্ষ্য থাকলেও, বাস্তবে কাঠামোগত অক্ষমতা এই প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করছে। ফলে, জনমতের উচ্চ প্রত্যাশা সত্ত্বেও রূপান্তরমূলক পরিবর্তন ঘটাতে সরকার ব্যর্থ হচ্ছে বলে সমালোচনা বাড়ছে।
বৃহত্তর জনসমর্থন সত্ত্বেও রাষ্ট্রীয় কাঠামোর পুরনো রূপান্তর না হওয়ার কারণ হিসেবে বিশ্লেষকরা কয়েকটি বিষয় উল্লেখ করছেন। প্রথমত, দীর্ঘমেয়াদী নীতি পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব। দ্বিতীয়ত, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষার জন্য গৃহীত কৌশলগুলো প্রায়শই সংস্কারকে ধীর করে। তৃতীয়ত, আন্তর্জাতিক আর্থিক সংস্থার শর্তাবলীর সাথে সামঞ্জস্য রেখে নীতি গঠন করা, যা দেশের স্বতন্ত্র উন্নয়ন লক্ষ্যের সঙ্গে কখনও কখনও বিরোধপূর্ণ হতে পারে।
অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে, বর্তমান সরকারকে “রিপেয়ার মোড” থেকে “ট্রান্সফরমেটিভ মোড”ে রূপান্তরিত করার প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে বলে মূল্যায়ন করা হচ্ছে। যদিও কিছু ক্ষেত্রে অবকাঠামো উন্নয়ন ও সামাজিক সুরক্ষার ব্যবস্থা বাড়ানো হয়েছে, তবে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, রপ্তানি সম্প্রসারণ এবং বিনিয়োগ আকর্ষণে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দেখা যায়নি। এই ঘাটতি দেশের দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক স্বায়ত্তশাসনকে প্রভাবিত করছে।
সাফল্য‑ব্যর্থতার দৃষ্টিকোণ থেকে এই সরকারকে ইতিহাসের কোন পর্যায়ে স্থাপন করা হবে, তা এখনও অনিশ্চিত। রাজনৈতিক বিজ্ঞান, সমাজবিজ্ঞান ও অর্থনীতির ক্লাসিক তত্ত্বগুলোকে একত্রে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সরকারটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষার মুখোমুখি, যেখানে জনমতের প্রত্যাশা ও বাস্তব নীতি বাস্তবায়নের মধ্যে পার্থক্য স্পষ্ট।
ভবিষ্যতে সরকারকে কীভাবে এগিয়ে নিতে হবে, তা নিয়ে বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি উন্মোচিত হয়েছে। কিছু বিশ্লেষক বলছেন, অর্থনৈতিক সংস্কারকে ত্বরান্বিত করতে স্বচ্ছতা ও দায়িত্বশীলতা বাড়াতে হবে, অন্যদিকে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সংলাপ ও সমঝোতা শক্তিশালী করা জরুরি। এছাড়া, সামাজিক চুক্তির পুনর্গঠন এবং নাগরিক অংশগ্রহণের সুযোগ বাড়িয়ে জনমতের সঙ্গে নীতি সমন্বয় করা দীর্ঘমেয়াদী স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে পারে।
সারসংক্ষেপে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ৫৫০ দিন পর এখন পর্যন্ত অর্জিত সাফল্য ও বিদ্যমান ব্যর্থতা উভয়ই স্পষ্ট। জনমতের উচ্চ প্রত্যাশা, অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ এবং প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর সীমাবদ্ধতা একসঙ্গে সরকারের ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশকে নির্ধারণ করবে। পরবর্তী সময়ে এই দ্বৈততা কীভাবে সমাধান হবে, তা দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার মূল চাবিকাঠি হয়ে থাকবে।



