চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর উদ্ভিদ সংগনিরোধ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, গত নভেম্বর মাসে সয়াবিনের আমদানি ১,৪৩,২৮৭ মেট্রিক টন, ডিসেম্বর মাসে ৩,২৩,৫২০ টন এবং জানুয়ারি মাসে ৩,৩১,১০৩ টন হয়েছে। এই পরিমাণের তুলনায়, গতকাল সয়াবিনের হোলসেল দামের মণিকিল ৭,০৫০ টাকা এবং পাম তেলের মণিকিল ৫,৯০০ টাকা নির্ধারিত হয়েছে। একই সময়ে চিনি, ছোলা ও অন্যান্য ভোগ্যপণ্যের দাম তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল রয়ে গেছে।
খাতুনগঞ্জের সোনা মিয়া মার্কেট সয়াবিন ও পাম তেলের প্রধান হোলসেল কেন্দ্র হিসেবে কাজ করে। এখানে শতাধিক তেল ব্যবসায়ী ও কয়েকশো ব্রোকার সক্রিয়ভাবে লেনদেন করে, এবং সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ক্রেতা-বিক্রেতার ক্রিয়াকলাপ তীব্র থাকে। বাজারের প্রধান বিক্রেতা মোহাম্মদ ইলাশের মতে, সয়াবিনের সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে; “বাজারে এখন কোনো স্টক নেই, আমরা পূর্বে ক্রয় করা তেল বিক্রি করছি, মিলগুলোতে নতুন সয়াবিন পৌঁছাচ্ছে না”। বর্তমানে মেঘনা ও টিকে গ্রুপের সয়াবিনই বাজারে পাওয়া যায়, অন্য কোনো কোম্পানির সয়াবিনের সরবরাহ নেই। নতুন সয়াবিন ক্রয় করলে প্রায় সাড়ে সাত হাজার টাকায় মণিকিল দিতে হবে।
সয়াবিন ও পাম তেলের দাম বাড়ার পেছনে ডিলার অর্গানাইজার (ডিও) ও স্লিপ (ক্রেডিট) ব্যবসার অস্বচ্ছ প্রক্রিয়া উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখছে। ডিও ব্যবসায়ীরা মিল থেকে নির্ধারিত সময়ে পণ্য সরবরাহ না করে, বহুবার হস্তান্তরে পরিবর্তন ঘটিয়ে দাম বাড়িয়ে দেয়। একই সঙ্গে স্লিপ ব্যবসা, যেখানে ক্রেতা ১০-১৫ দিনের মধ্যে অগ্রিম টাকা দিয়ে তেল বা চিনি কিনে, ডেলিভারির সময় বাকি টাকা পরিশোধ করে, হস্তান্তরের বিলম্বের ফলে স্লিপের মেয়াদ বাড়ে এবং দাম বাড়ে।
বাজারের অংশগ্রহণকারীরা উল্লেখ করছেন, ডিও ও স্লিপের এই অনৈতিক লেনদেন বন্ধ না করলে পণ্যের মূল্যে অতিরিক্ত বৃদ্ধি রোধ করা কঠিন হবে। খাতুনগঞ্জের কিছু ডিও ব্যবসায়ী দীর্ঘদিন ধরে এই প্রথায় যুক্ত, যা বাজারের স্বচ্ছতা ও ন্যায্য মূল্যের জন্য হুমকি সৃষ্টি করছে।
সরকারি নিয়ম অনুযায়ী, ডিওর ডেলিভারি সময়সীমা ১৫ দিন নির্ধারিত ছিল, যার মধ্যে পণ্য সরবরাহ সম্পন্ন করতে হতো। তবে বাস্তবে এই সময়সীমা প্রায়শই অমান্য হয়, ফলে স্লিপের মেয়াদ বাড়ে এবং শেষ পর্যন্ত ভোক্তাদের উপর অতিরিক্ত খরচ চাপায়।
বিশ্লেষকরা সতর্ক করছেন, সয়াবিন ও পাম তেলের সরবরাহ সংকট যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তবে দাম আরও বাড়তে পারে এবং সংশ্লিষ্ট শিল্পের উৎপাদন খরচে প্রভাব ফেলবে। বিশেষ করে তেল মিলগুলোকে কাঁচামালের ঘাটতি মোকাবেলায় বিকল্প সরবরাহ চ্যানেল গড়ে তুলতে হবে।
বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে, ডিও ও স্লিপের লেনদেনের স্বচ্ছতা বাড়ানো, হস্তান্তরের সময়সীমা কঠোরভাবে অনুসরণ করা এবং অনিয়মিত ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
এছাড়া, সয়াবিনের আমদানি পরিমাণ বাড়িয়ে সরবরাহের ঘাটতি পূরণ করা এবং স্থানীয় উৎপাদন বাড়ানোর জন্য নীতি সমর্থন করা দরকার। সরকার যদি আমদানি প্রক্রিয়াকে সহজ করে এবং সাপ্লাই চেইনের দক্ষতা বাড়ায়, তবে হোলসেল বাজারে দাম স্থিতিশীল হতে পারে।
খাতুনগঞ্জের বাজারে বর্তমানে সয়াবিন ও পাম তেলের দাম বাড়ার প্রবণতা দেখা দিচ্ছে, তবে চিনি ও ছোলার মতো অন্যান্য ভোগ্যপণ্যের দাম তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল। এই বৈষম্য বাজারের কাঠামোগত সমস্যার ইঙ্গিত দেয়, যেখানে নির্দিষ্ট পণ্যের সরবরাহ চেইনে অস্বচ্ছতা ও দেরি মূল্যের অস্থিরতা বাড়িয়ে তুলছে।
সামগ্রিকভাবে, সয়াবিন ও পাম তেলের দাম বৃদ্ধির মূল কারণ সরবরাহের ঘাটতি, ডিও ও স্লিপের অনিয়মিত লেনদেন এবং বাজারের কাঠামোগত অদক্ষতা। এই সমস্যাগুলি সমাধানের জন্য নীতি নির্ধারক, ব্যবসায়ী ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার সমন্বিত পদক্ষেপ প্রয়োজন, যাতে বাজারের স্বচ্ছতা, ন্যায্য মূল্য এবং ভোক্তাদের স্বার্থ রক্ষিত হয়।



