লস এঞ্জেলেসের সুপিরিয়র কোর্টে একটি নতুন মামলা শুরু হয়েছে, যেখানে মেটা এবং ইউটিউবের প্ল্যাটফর্মগুলোকে মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর ক্ষতিকারক প্রভাব ফেলা অভিযোগ করা হয়েছে। বিচারক ক্যারোলিন বি. কুহল এবং জুরি সদস্যদের সামনে মামলার সূচনা হয়েছে। মামলাকারী হলেন কেজি.জি.এম., যাকে প্রায়শই কালি জি.এম. নামে উল্লেখ করা হয়। তার আইনজীবী মার্ক ল্যানিয়ার মামলাটিকে সামাজিক মিডিয়া আসক্তির একটি বড় উদাহরণ হিসেবে উপস্থাপন করছেন।
কেজি.জি.এম. যখন নাবালিকা ছিলেন, তখনই তার সামাজিক মিডিয়া ব্যবহার বাড়তে থাকে এবং তার মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে বলে দাবি করা হয়েছে। তার পরিবার ও চিকিৎসা দল জানিয়েছে যে তিনি উদ্বেগ, ঘুমের ব্যাঘাত এবং আত্মসম্মানের হ্রাসের মতো সমস্যার শিকার হয়েছেন। এই সমস্যাগুলোকে সরাসরি মেটা এবং ইউটিউবের ডিজাইন পদ্ধতির সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। তাই তিনি আদালতে তার ক্ষতিপূরণ ও ভবিষ্যৎ ব্যবহারকারীদের সুরক্ষার দাবি তুলেছেন।
মার্ক ল্যানিয়ার তার উদ্বোধনী বক্তব্যে জোর দিয়ে বলেছেন যে মেটা এবং ইউটিউবের প্ল্যাটফর্মগুলোকে এমনভাবে গড়ে তোলা হয়েছে যাতে ব্যবহারকারীর মস্তিষ্কে আসক্তি সৃষ্টির প্রক্রিয়া স্বয়ংক্রিয়ভাবে কাজ করে। তিনি উল্লেখ করেন যে এই কোম্পানিগুলো জানাশোনা করে শিশুদের মনোযোগকে টেনে নিয়ে তাদের সময় বাড়ানোর কৌশল ব্যবহার করেছে। ল্যানিয়ার দাবি করেন যে এই নকশা কেবলই লাভজনক নয়, বরং নৈতিক দায়িত্বের লঙ্ঘনও। তিনি আদালতে প্রমাণ উপস্থাপন করে দেখাতে চান যে এই প্রতিষ্ঠানগুলো ইচ্ছাকৃতভাবে আসক্তি তৈরির যন্ত্র তৈরি করেছে।
মামলায় ‘আসক্তি মেশিন’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে, যা মেটা ও ইউটিউবের অ্যালগরিদমকে বর্ণনা করে যা ব্যবহারকারীর মনোযোগকে দীর্ঘ সময় ধরে ধরে রাখে। ল্যানিয়ার উল্লেখ করেন যে এই মেশিনগুলো বিশেষ করে শিশুরা এবং কিশোর-কিশোরীদের লক্ষ্য করে তৈরি করা হয়েছে। তিনি বলেন যে এই ধরনের ডিজাইন ব্যবহারকারীর স্বায়ত্তশাসনকে ক্ষুন্ন করে এবং তাদের দৈনন্দিন জীবনে ব্যাঘাত ঘটায়। এই দৃষ্টিকোণ থেকে তিনি কোম্পানিগুলোর নৈতিক দায়িত্বকে প্রশ্নবিদ্ধ করছেন।
বক্তব্যের সময় ল্যানিয়ার একটি ছোট টেবিলে শিশুদের ব্লক সাজিয়ে দেখিয়েছেন, যেখানে ‘Addicting’, ‘Brains’ এবং ‘Children’ শব্দগুলো A, B, C অক্ষরের পাশে রাখা হয়েছে। এই দৃশ্যটি আদালতে উপস্থিত সবাইকে বিষয়ের গুরুত্ব অনুভব করাতে ব্যবহৃত হয়েছে। তিনি এই ভিজ্যুয়াল উপস্থাপনাকে তার যুক্তির সমর্থন হিসেবে তুলে ধরেছেন। এই পদ্ধতি মামলায় একটি স্মরণীয় মুহূর্ত হিসেবে রেকর্ড হয়েছে।
মেটার সিইও মার্ক জুকারবার্গের ২০১৫ সালের একটি ইমেইলও প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছে, যেখানে তিনি প্ল্যাটফর্মে ব্যবহারকারীর সময়কে ১২% বাড়ানোর লক্ষ্য নির্ধারণের কথা উল্লেখ করেন। এই ইমেইলটি কোম্পানির অভ্যন্তরীণ লক্ষ্যকে স্পষ্টভাবে প্রকাশ করে, যা ব্যবহারকারীর সময় বাড়িয়ে আয় বৃদ্ধি করার উদ্দেশ্যকে নির্দেশ করে। ল্যানিয়ার এই নথি থেকে যুক্তি টানেন যে কোম্পানি জানাশোনা করে ব্যবহারকারীর মনোযোগকে বাড়িয়ে রাখার পরিকল্পনা করেছে। এই ধরনের অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ আদালতে প্রথমবারের মতো প্রকাশ পেয়েছে।
ইউটিউবের ক্ষেত্রে, ল্যানিয়ার বলেন যে গুগল মালিকানাধীন এই প্ল্যাটফর্মটি তরুণ ব্যবহারকারীদের লক্ষ্য করে বিজ্ঞাপনদাতাদের থেকে বেশি অর্থ আদায়ের পরিকল্পনা করেছে। তিনি ইউটিউব কিডসের তুলনায় মূল ইউটিউবের বিজ্ঞাপন দামের পার্থক্য তুলে ধরে দেখিয়েছেন যে কোম্পানি শিশুদের জন্য আলাদা প্ল্যাটফর্ম তৈরি করেও মূল সাইটে তাদের আকৃষ্ট করার কৌশল ব্যবহার করেছে। এই কৌশলকে তিনি ‘ডিজিটাল বেবিসিটিং’ সেবা হিসেবে বর্ণনা করেছেন, যেখানে ব্যস্ত অভিভাবকরা তাদের সন্তানকে অনলাইন কন্টেন্টে ব্যস্ত রাখতে ইউটিউবের ওপর নির্ভর করেন। ল্যানিয়ার এই দিকটি আদালতে তুলে ধরে কোম্পানির লাভজনক উদ্দেশ্যকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন।
মেটা ও ইউটিউবের আইনজীবীরা এই অভিযোগের প্রতিক্রিয়ায় বলছেন যে কেজি.জি.এম.ের আসক্তি তার ব্যক্তিগত জীবনের অন্যান্য সমস্যার ফল, কোম্পানিগুলোর কোনো অবহেলা নেই। তারা যুক্তি দেন যে প্ল্যাটফর্মের নকশা ব্যবহারকারীর স্বায়ত্তশাসনকে সম্মান করে এবং কোনো সরাসরি ক্ষতি করার উদ্দেশ্য নেই। এছাড়া, তারা উল্লেখ করেন যে সামাজিক মিডিয়া ব্যবহার একটি স্বেচ্ছায় করা কার্যক্রম এবং ব্যবহারকারীর দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। এই রকম যুক্তি দিয়ে তারা মামলাটিকে প্রত্যাখ্যানের চেষ্টা করবে।
এই মামলাটি প্রযুক্তি শিল্পের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে, কারণ এটি প্রথমবারের মতো বড় সামাজিক মিডিয়া কোম্পানিগুলোর নকশা ও ব্যবসায়িক কৌশলকে আদালতে পরীক্ষা করে। যদি আদালত মেটা ও ইউটিউবের বিরুদ্ধে দায়িত্ব নির্ধারণ করে, তবে তা ভবিষ্যতে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের নীতি ও নিয়ন্ত্রণে বড় পরিবর্তন আনতে পারে। বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করছেন যে এই ধরনের আইনি পদক্ষেপ ব্যবহারকারীর সুরক্ষা ও মানসিক স্বাস্থ্যের রক্ষায় নতুন মানদণ্ড স্থাপন করতে পারে। ফলে, প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোকে তাদের পণ্য ও সেবার নকশা পুনর্বিবেচনা করতে হতে পারে।
মামলার প্রথম দিনটি শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে উভয় পক্ষই পরবর্তী শুনানির জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে, যেখানে অতিরিক্ত নথি ও সাক্ষ্য প্রদান করা হবে। বিচারক ক্যারোলিন বি. কুহল মামলার অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করবেন এবং প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেবেন। উভয় পক্ষের জন্য এই পর্যায়টি কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি শেষ পর্যন্ত মামলার ফলাফলকে প্রভাবিত করবে। শেষ পর্যন্ত, এই বিচারটি ডিজিটাল যুগে সামাজিক মিডিয়ার ভূমিকা ও দায়িত্ব সম্পর্কে একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার সূচনা করবে।



