৯ ফেব্রুয়ারি সোমবার সন্ধ্যায় ঢাকা শহরে বাংলাদেশ সরকার ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে একটি দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। এই চুক্তি ‘রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ’ বা পাল্টা শুল্কের হার ১৯ শতাংশে নামিয়ে আনতে লক্ষ্য রাখে। চুক্তি স্বাক্ষরের মাধ্যমে দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ককে নতুন স্তরে নিয়ে যাওয়া হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ সরকারের বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশির উদ্দিন ও জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমান উপস্থিত ছিলেন। যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধি, রাষ্ট্রদূত জেমিসন গ্রিয়ার চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। আলোচনাটি গত বছরের এপ্রিল থেকে নয় মাসের দীর্ঘ আলোচনার পর সমাপ্ত হয়।
পাল্টা শুল্কের হার গত বছর ৩৭ শতাংশে শুরু হয়ে পরে ৩৫ শতাংশে হ্রাস পায়। এরপর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্দেশে ৩১ জুলাই শুল্ক ২০ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়। বর্তমান চুক্তি সেই হারকে আরও কমিয়ে ১৯ শতাংশে স্থির করেছে, যা দুই দেশের বাণিজ্যিক প্রবাহকে ত্বরান্বিত করবে।
চুক্তি স্বাক্ষরের পর বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশির উদ্দিন উল্লেখ করেন, এই সমঝোতা দুই দেশের বাজারে পণ্যের প্রবেশের সুযোগকে বহুগুণ বাড়াবে এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতার নতুন মাইলফলক স্থাপন করবে। তিনি আরও বলেন, শুল্ক হ্রাসের ফলে রপ্তানিকারকদের জন্য খরচ কমে যাবে এবং রপ্তানি পরিমাণে উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি প্রত্যাশিত।
জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমানও শুল্ক কমানোর প্রভাব তুলে ধরেন, বিশেষ করে পোশাক শিল্পে শূন্য শুল্ক সুবিধা নতুন গতিবেগ যোগাবে। তিনি উল্লেখ করেন, রপ্তানিকৃত পণ্যের প্রতিযোগিতামূলক ক্ষমতা বাড়বে এবং রপ্তানি বাজারের বৈচিত্র্য বৃদ্ধি পাবে। এ ধরনের সুবিধা রপ্তানিকৃত পণ্যের গুণগত মান উন্নয়নে সহায়তা করবে।
বাংলাদেশের বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমান ও মার্কিন সহকারী বাণিজ্য প্রতিনিধি ব্রেন্ডন লিঞ্চও স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। তাদের উপস্থিতি চুক্তির আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ও কার্যকরী পর্যায়ে দ্রুত অগ্রগতি নিশ্চিত করবে।
স্বাক্ষরের পর বাংলাদেশ সরকারের উপদেষ্টা পরিষদে চুক্তিটি আনুষ্ঠানিকভাবে অনুমোদিত হয়েছে। উভয় দেশের সরকার থেকে আনুষ্ঠানিক বিজ্ঞপ্তি জারির পর চুক্তি কার্যকর হবে বলে জানানো হয়েছে।
শুল্ক হ্রাসের ফলে বাংলাদেশের গার্মেন্টস শিল্পে বিশেষ সুবিধা পাবার সম্ভাবনা রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রবেশের বাধা কমে যাওয়ায় রপ্তানি পরিমাণ বাড়বে এবং নতুন ক্রেতা গোষ্ঠী গড়ে উঠবে। এছাড়া, শূন্য শুল্ক সুবিধা পাওয়া পণ্যগুলোর জন্য উৎপাদন খরচ কমে যাবে, যা আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় সুবিধা দেবে।
পাল্টা শুল্কের এই পরিবর্তন অন্যান্য সেক্টরেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে বিশ্লেষকরা অনুমান করছেন। কৃষি পণ্য, হস্তশিল্প এবং প্রযুক্তি-ভিত্তিক পণ্যের রপ্তানি বাড়তে পারে, যা বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে সহায়তা করবে। তবে শুল্ক হ্রাসের ফলে স্থানীয় বাজারে কিছু প্রতিযোগিতামূলক চাপও বৃদ্ধি পেতে পারে, যা নীতি নির্ধারকদের জন্য পর্যবেক্ষণযোগ্য বিষয়।
দীর্ঘমেয়াদে এই চুক্তি বাংলাদেশ সরকার ও মার্কিন সরকার উভয়ের জন্য বাণিজ্যিক সম্পর্ককে দৃঢ় করার ভিত্তি তৈরি করবে। শুল্কের ধারাবাহিক হ্রাস এবং বাজারের প্রবেশ সহজতর করা নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে পারে। তবে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা এবং মুদ্রা পরিবর্তনের ঝুঁকি চুক্তির পূর্ণ সম্ভাবনা অর্জনে বাধা সৃষ্টি করতে পারে, তাই উভয় পক্ষই সতর্কতা অবলম্বন করবে।
সারসংক্ষেপে, ১৯ শতাংশে নামানো পাল্টা শুল্ক চুক্তি বাংলাদেশ সরকার ও যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যিক সহযোগিতার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে এবং রপ্তানি ভিত্তিক শিল্পগুলোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ তৈরি করেছে। ভবিষ্যতে এই চুক্তি কীভাবে বাস্তবায়িত হবে তা দেশের অর্থনৈতিক নীতি ও আন্তর্জাতিক বাজারের গতিবিধির ওপর নির্ভরশীল।



