ডা. শফিকুর রহমান, জামায়াত-এ-ইসলামির আমির, ৯ ফেব্রুয়ারি সোমবার জাতির উদ্দেশে বিটিভিতে সরাসরি ভাষণ দিয়ে দেশের ভবিষ্যৎ গঠনের জন্য বেশ কিছু মূল নীতি তুলে ধরেন। তিনি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পরপরই এই বক্তব্য রাখেন, যেখানে নারীর নিরাপত্তা, যুব নেতৃত্ব এবং ধর্মীয় সহনশীলতা প্রধান অগ্রাধিকার হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
ভাষণে ডা. শফিকুর রহমান উল্লেখ করেন, ক্ষমতার শীর্ষে পৌঁছালে নারীদের জন্য সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে এবং এ লক্ষ্যে সরকারী নীতি ও আইন প্রয়োগে কঠোরতা বজায় থাকবে। তিনি বলেন, কোনো ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে আক্রমণ বা নিপীড়ন ঘটলে তা তীব্রভাবে মোকাবিলা করা হবে এবং সকল ধর্মের মানুষের মৌলিক অধিকার রক্ষাকে জামায়াত-এ-ইসলামির নৈতিক দায়িত্ব হিসেবে গণ্য করা হবে।
তরুণদেরকে দেশের ‘ক্যাপ্টেন’ হিসেবে গড়ে তোলার কথা তিনি পুনরায় জোর দেন। শফিকুর রহমানের মতে, ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের দায়িত্বের জন্য বয়সের সীমা না রেখে দক্ষ ও উদ্যমী তরুণদেরকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত, আর প্রবীণরা সহযাত্রী হিসেবে ভূমিকা রাখবে। এই দৃষ্টিভঙ্গি তার পার্টির তরুণ কর্মীদের মধ্যে বিশেষভাবে গৃহীত হয়েছে।
ধর্মীয় সহনশীলতার ক্ষেত্রে তিনি স্পষ্ট করে বলেন, ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর ওপর আক্রমণ করা হলে তা কঠোরভাবে বিরোধিতা করা হবে এবং সকল ধর্মের মানুষের মৌলিক অধিকার রক্ষার দায়িত্ব জামায়াত-এ-ইসলামির নৈতিক দায়িত্ব হিসেবে স্বীকার করা হবে। তিনি ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য বিশেষ নীতি প্রণয়নের প্রতিশ্রুতি দেন।
অবিচলতা, ন্যায়পরায়ণতা, দক্ষতা এবং কর্মসংস্থানকে ‘হ্যাঁ’ এবং দুর্নীতি, আধিপত্যবাদ ও চাঁদাবাজিকে ‘না’ বলার আহ্বান জানিয়ে তিনি ১১ দলীয় জোটের প্রার্থীদের ভোট দিয়ে জয়ী হওয়ার জন্য সমর্থকদের অনুরোধ করেন। এই আহ্বান নির্বাচনী সময়ে বিরোধী দলের সমর্থকদের কাছেও প্রতিধ্বনিত হয়েছে।
বিচার ব্যবস্থার ব্যাপক সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে তিনি জোর দেন, সৎ, দক্ষ ও ন্যায়পরায়ণ ব্যক্তিদের বিচারকের আসনে বসিয়ে সাধারণ মানুষকে প্রকৃত ন্যায়বিচার প্রদান করা হবে। বিচারিক সংস্কারের জন্য তিনি পার্টির অভ্যন্তরে বিশেষ কমিটি গঠন এবং স্বচ্ছতা বাড়ানোর পরিকল্পনা উল্লেখ করেন।
ধর্মীয় সংগঠনগুলোর ভূমিকা নিয়ে তিনি তাবলিগ জামায়াতের কর্মীদেরকে দেশের উন্নয়নে সক্রিয়ভাবে অংশ নিতে আহ্বান জানান। একই সঙ্গে তিনি অনিচ্ছাকৃতভাবে কোনো ব্যক্তিকে ‘ট্যাগ’ দিয়ে নিপীড়ন বা হত্যা করা বন্ধ করার গুরুত্ব তুলে ধরেন এবং এ ধরনের কাজের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন।
প্রবাসী বাংলাদেশীদের অধিকার রক্ষার কথাও তিনি উল্লেখ করেন। শফিকুর রহমানের মতে, প্রবাসে বসবাসকারী নাগরিকের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার দায়িত্ব রাষ্ট্রের, এবং প্রবাসে মৃত্যুবরণ করলে তা সম্মানের সঙ্গে পরিচালিত হবে। তিনি প্রবাসী কর্মীদের জন্য বিশেষ সহায়তা ও সেবা নিশ্চিত করার পরিকল্পনা ঘোষণা করেন।
ভাষণের শেষাংশে তিনি নির্বাচনী প্রচারণাকালে জামায়াত-এ-ইসলামির কোনো নেতা বা কর্মীর আচরণে যদি কোনো নাগরিক কষ্ট পেয়ে থাকেন, তবে তার জন্য আন্তরিক দুঃখ প্রকাশ করেন এবং ক্ষমা চান। এই দৃষ্টিভঙ্গি পার্টির অভ্যন্তরে শৃঙ্খলা বজায় রাখার ইচ্ছা প্রকাশ করে।
বিপক্ষের কিছু নেতা এখনও এই প্রতিশ্রুতিগুলোর প্রতি স্পষ্ট মন্তব্য করেননি, তবে তারা নির্বাচনী সময়ে স্বচ্ছতা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার দাবি পুনর্ব্যক্ত করেছে। বিরোধী দলগুলো সাধারণত নারী নিরাপত্তা ও যুব ক্ষমতায়নের বিষয়কে গুরুত্ব দেয়, যদিও তাদের নির্দিষ্ট নীতি ভিন্ন হতে পারে।
বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন, শফিকুর রহমানের এই প্রতিশ্রুতিগুলো ভোটারদের মধ্যে বিশেষ করে নার ও তরুণদের মধ্যে ইতিবাচক সাড়া পেতে পারে, যা জামায়াত-এ-ইসলামির নির্বাচনী ফলাফলে প্রভাব ফেলতে পারে। তবে বাস্তবায়নের জন্য পার্টির অভ্যন্তরে এবং দেশের রাজনৈতিক পরিবেশে যথাযথ সমর্থন ও তদারকি প্রয়োজন হবে।
সারসংক্ষেপে, জামায়াত-এ-ইসলামির আমিরের ভাষণ নারীর নিরাপত্তা, যুব নেতৃত্ব, ধর্মীয় সহনশীলতা, বিচার সংস্কার এবং প্রবাসী অধিকারসহ বহু ক্ষেত্রকে অন্তর্ভুক্ত করেছে, যা দেশের রাজনৈতিক আলোচনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে। ভবিষ্যতে এই নীতিগুলোর বাস্তবায়ন কতটা কার্যকর হবে, তা পরবর্তী সময়ে স্পষ্ট হবে।



